‘আপন কেউ আক্রান্ত হলে দূরে থাকা যায় না’

‘চিকিৎসক-নার্স হলে না হয় দূরে থাকতে পারে, কিন্তু আপন কেউ আক্রান্ত হলে দূরে থাকা যায় না’ – এভাবেই স্বামীকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় কথাগুলো বলছিলেন সাবিনা। স্বামী করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে। শারীরিক অসুস্থতা কিছুটা কম এবং অক্সিজেন স্যাচুরেশন বেশ ভালো থাকায় চিকিৎসকের পরামর্শে স্বামীকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ির দিকে রওনা হন তিনি।

সাবিনার মতো অনেকেই আছেন, যারা তাদের স্বজনকে সঙ্গে করে নিয়ে আসছেন হাসপাতালে। নিজে সুস্থ থাকলেও প্রিয়জনের মাধ্যমে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকলেও তা আমলে নিয়েই তাদের সেবায় পাশে থাকছেন। কেউ খাইয়ে দিচ্ছেন খাবার, কেউ বা ওষুধ আনতে ছুটে যাচ্ছে ফার্মেসিতে। এভাবেই করোনা ডেডিকেটেড এই হাসপাতাল থেকে বের হচ্ছেন আর প্রবেশ করছেন রোগীদের স্বজনরা। মহামারির মাঝেও প্রিয়জনকে সারিয়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তারা।

রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন পরিবারের লোকেরা
সাবিনার স্বামী করোনা পজিটিভ হওয়ার খবর পান গত মঙ্গলবার (২০ এপ্রিল)। এরপর অক্সিজেন স্যাচুরেশন কিছুটা কমে গেলে মহাখালীর এই হাসপাতালে নিয়ে আসেন। মাত্র একদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। শারীরিক অবস্থা কিছুটা উন্নতি হলে বাসায় চিকিৎসা নেওয়াকেই সুবিধাজনক বলে মনে করেন তার স্বামী। বৃহস্পতিবার দুপুরে তার স্বামীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে হেঁটেই যাচ্ছিলেন গেটের দিকে। সঙ্গে আছেন তার স্ত্রী। স্ত্রীর হাতে হাসপাতালের কাগজ এবং রিপোর্ট। সাবিনার স্বামী জানালেন, ‘চিকিৎসকদের কথা শুনে মনে হলো— বাসায় থেকে চিকিৎসা নেওয়া বেটার।’

এ সময় সাবিনা বলেন, ‘এখানে শুধু অক্সিজেনেরই ট্রিটমেন্ট দেওয়া হয়েছে। আমার স্বামীকে যে ডাক্তার দেখাইছিলাম উনি মুখে খাওয়ার জন্য কিছু ওষুধ দিয়েছিলেন। ওইটার সঙ্গে একটা অ্যান্টিবায়োটিক যুক্ত করে দিয়েছে। তাই ভাবলাম, শুধু অক্সিজেনের জন্য এখানে থাকার কোনও মানে হয় না। গতকাল অক্সিজেন ছিল ৯৪, আজকে ৯৬ আছে। যদি দরকার পড়ে বাসাতেই অক্সিজেনের সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করবো।’

হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স আর রোগীদের ভিড়
তিনি আরও বলেন, ‘আমিও একটি হাসপাতালে কাজ করি। রোগী হলে দূরত্ব মানা যায়, কিন্তু নিজের কারও হলে দূরত্ব মানা যায় না। এখানে কিছুই করার নাই।’

শহিদুল ইসলাম রায়েরবাগ থেকে নিজের মাকে নিয়ে এসেছেন ডিএনসিসি’র এই হাসপাতালে। তার মা করোনা আক্রান্ত। মায়ের জন্য চিকিৎসকের লেখা প্রেসক্রিপশন নিয়ে বের হচ্ছিলেন ওষুধ কিনতে। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সকালেই তার মাকে এখানে ভর্তি করিয়েছেন। লক্ষণ-উপসর্গ তেমন কিছুই ছিল না, তিন দিন ধরে দৌড়াদৌড়ি করতেছি। এরপর তারা জানালো বাইরে থেকে টেস্ট করে নিয়ে আসতে। যদি পজিটিভ হয় তাহলে ভর্তি নেবে। বাইরে থেকে টেস্ট করিয়েছি। রাত ২টায় রিপোর্ট পাই। এরপর সকালে রিপোর্ট নিয়ে এসেছি এখানে।

হুইলচেয়ারে করোনা রোগী
তিনি আরও বলেন, ‘রিস্ক থাকলেও কিছু করার নাই। এই যে এখন ওষুধ লাগবে। এরপর আবার কখন লাগবে জানি না। থাকতে তো হবেই। ইনজেকশন লাগে, তাছাড়া অন্যান্য ওষুধ লাগে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল চালু হওয়ার পর চতুর্থ দিন পর্যন্ত আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন ৯০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালটিতে সাত জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। মারা ব্যক্তিদের মধ্যে তিন জন ঢাকার এবং চার জন ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগী। এছাড়া এ পর্যন্ত ১৫৭ জন ভর্তি হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (২২ এপ্রিল) দুপুর ১২টায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিরউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘যারা এই হাসপাতালে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন, তাদের অধিকাংশেরই বয়স ৬৫ থেকে ৭৫ বছরের মধ্যে।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top