সেহরি পার্টি: শহরে নতুন সংস্কৃতি

উন্নত দেশগুলোতে সাধারণত শহরগুলো সারা রাতই জেগে থাকে। কর্মব্যস্ত দিন শেষে প্রায় সকল মানুষ রাতের কোলেই মেতে ওঠে আনন্দ, বিনোদন কিংবা একান্ত আড্ডায়। কিন্তু সেদিক থেকে আমাদের দেশ অনেকবেশি রক্ষণশীল। তবে শুধু সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের জন্য নয়- রাজনৈতিক অবস্থা, আইন শৃঙ্খলার ঢিলেঢালা মনোভাব এবং নিরাপত্তাজনিত কারণেই সম্ভব হয়না রাতকে উপভোগ্য করে তোলা। অবশ্য সারাবছরের সঙ্গে মেলানো যাবে না সংযমের মাসকে। আজকাল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে নতুন এক ধারণা- সেহরি পার্টি।

হ্যাঁ, এখন রোজার মাসে ইফতার পার্টির পাশাপাশি চলছে ভোর রাতে আয়োজিত সেহরি পার্টি। বেশ কয়েক বছর আগেই শুরু হয়েছে সেহেরি পার্টির এই সংস্কৃতি। ধনী সমাজ, কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড কিংবা শোবিজ জগতের ছোটখাট দলের মধ্যে প্রচলিত থাকলেও সময়ের ব্যবধানে এই পার্টি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন স্তরে। বিশেষত তারকাসমৃদ্ধ সেহরি পার্টির খবর পাওয়া যায় প্রায়ই। আর দল বেঁধে কোন পছন্দের হোটেল বা স্থানে পার্টির জন্য বেরিয়ে যাওয়া তো নৈমিত্তিক ঘটনা।

হ্যাঁ, বর্তমানে সেহরি পার্টির চলতি ট্রেন্ড। ভোর রাতে একত্রে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে পার্টিতে অংশগ্রহণ করছে। আবার এমনও হয়, সারারাত গল্প-গান-আড্ডাবাজি শেষে সেহরি পার্টিতে অংশ নিতে যাচ্ছেন দল বেঁধে। অবশ্য সেহরি পার্টির উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সেহরি খাওয়াই নয়। পুনর্মিলনি, সবার সঙ্গে দেখা হওয়া কিংবা সামাজিক আচারের মধ্যে পড়ে গেছে এই পার্টি। আবার অনেক সময় ধর্মের সীমাবদ্ধতাও থাকছে না এই মিলন মেলায়।

পুরান ঢাকার আল রাজ্জাক হোটেলে মিডিয়ার বিভিন্ন লোকজন তাদের বন্ধু বান্ধব ও পরিবার নিয়ে সেহরি খেতে যেতেন। এরপর বিভিন্ন মানুষজন তাদের পরিবার অথবা বন্ধু বান্ধব নিয়ে একসঙ্গে সেহরি খাওয়া শুরু করেন। এভাবেই গড়ে উঠে নতুন কলচার- সেহরি পার্টি। এখন নিয়মিতই পুরান ঢাকার আল রাজ্জাক হোটেল, ঠাটারি বাজারের স্টার হোটেল, বঙ্গবাজারের সুপার স্টার সেহেরি পার্টির জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

এসব হোটেল সেহরি পার্টির জন্য জনপ্রিয় হওয়ার কারণ, আগে থেকেই এলাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মচারীর জন্য সারা রাত খোলা থাকতো। এরপর লোকজনের সমাগম বেড়ে যাওয়ায় তাদের আয়োজন বাড়াতে হয়। এখন ভোরে সেহরির সময় এতাে ভিড় হয়, সিটের জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকেন অনেকেই।

লেখক শাকুর মজিদ এবার এক সেহরি পার্টির আয়োজন করেছিল। সেহরি পার্টি নিয়ে তিনি বলেন, ‘গত দুবছর ধরেই আমরা সেহরির সময় পুরোনো ঢাকার বিভিন্ন রেস্তোঁরায় বন্ধু বান্ধবরা মিলে খাবার খেতে যাই, পরিবার নিয়েও যাই। মূলত রোজার মাসে সেহরি খেয়ে ঘুমাই। তাই সারা রাত জেগে থাকতে হয়। তখন বন্ধুরা একসঙ্গে আড্ডা দেই, খাওয়া দাওয়া করি। রোজার মাস আসলেই রাতে খাওয়া হয়। এছাড়া বছরের অন্যান্য সময় তো রাতে এরকম কোন আয়োজন থাকে না। আর দিনে পুরানো ঢাকা অনেক জ্যাম থাকে, ভোরে ফাঁকা থাকে বলে যাতায়াত সহজ হয়।’

এছাড়া টেলিভিশন চ্যানেল গান বাংলাও রোজায় সেহরির পার্টির আয়োজন করেছিল। সেই সেহরি পার্টিতে আইয়ুব বাচ্চু, মাকসুদ, হাবিব চিত্র নায়ক আরেফিন শুভ, ইমন, জয়া আহসানসহ দেশের অনেক খ্যাতিমান সংস্কৃতকর্মীই উপস্থিত ছিলেন।
সেহরি পার্টির খাবার তালিকায় কি থাকে? মূলত রাতে যা পাওয়া যায়, সেসবই খাবারই থাকে। সাদা ভাতের সঙ্গে মুরগি মাসালা, ঝাল ফ্রাই খাসির গ্লাসি, খাশির রোস্ট, বিভিন্ন ছোট বড় মাছ থাকে। এছাড়া কাচ্চি, মোরগ পোলাও তো রয়েছেই। খাবারের পর থাকে মিষ্টি জাতীয় নানা খাবার। ফল, জুস, লাস্যি কিংবা শরবত জাতীয় পানীয় তো থাকেই। তবে ব্যক্তিগত পার্টিতে খাবারের তালিকায় বৈচিত্র থাকে পছন্দ, আয়োজন, প্রয়োজন এবং বিশেষত্বভেদে।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top