হজরত মুসার [আ.] অনুসারী সামেরির স্বর্ণ-বাছুর তৈরির ঐতিহাসিক কাহিনী!

হজরত মুসা [আ.]-এর সহায়তায় বনি ইসরাইল সম্প্রদায় ততোদিনে মিসর ছেড়ে লোহিত সাগর পেরিয়ে জর্দান সীমান্তের কাছাকাছি সিনাই উপত্যকায় পৌঁছে গেছে। এ সময় আল্লাহ তাআলা মুসা [আ.]-এর উম্মত বনি ইসরাইলের জন্য পূর্ণাঙ্গ একটি প্রত্যাদেশপত্র দেবেন বলে নবি মুসাকে তুর পর্বতে ডেকে পাঠান। তিনি তার সম্প্রদায়ের ৭০ জন বিশিষ্টব্যক্তিকে নিয়ে তুর পর্বত অভিমুখে চলে যান। তিনি ফিরে না আসা তক বাকিদের এখানেই অবস্থান করতে বলেন। নবি মুসার অনুপস্থিতিতে বনি ইসরাইল সম্প্রদায়ের ‘সামেরি’ নামক এক ধূর্ত কামার চরম ধৃষ্টতামূলক এক কাজ করে বসে। ঘটনাটি এরকম- ইসরাইলিরা যখন মিসর থেকে পালিয়ে আসে তখন ইসরাইলি নারীরা তাদের প্রতিবেশী মিসরীয় নারীদের কাছ থেকে এই বলে স্বর্ণালঙ্কার ধার নিয়ে আসে- আমরা একটি ধর্মীয় উৎসব পালনে মিসরের বাইরে যাচ্ছি। উৎসব শেষ করে ফিরে এসে তোমাদের অলঙ্কার ফিরিয়ে দেবো। কিন্তু তারা মূলত মিথ্যা বলে তাদের থেকে অলঙ্কার নিয়ে আসে।

তারা যখন জর্দান-ফিলিস্তিন সীমান্তে অবস্থানরত তখন ধূর্ত সামেরি ফন্দি এঁটে সবার মাঝে বলতে থাকে, মিসরীয়দের কাছ থেকে চেয়ে আনা স্বর্ণ অপরের ধন। তাই তা তাদের জন্যে ব্যবহার অবৈধ, সেগুলো তাদের কাছ থেকে দূর করা আবশ্যক। তখন ইসরাইলি মেয়েরা তাদের সঙ্গে আনা স্বর্ণালংকার নিয়ে এলো। সামেরি সেখানে অবস্থানরত হারুন [আ.]-কেও কৌশলে সেখানে উপস্থিত করলো। সমস্ত অলঙ্কার একত্রিত করে সেগুলো সামেরি একটা গর্তে ছুঁড়ে ফেললো। এরপর সেগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো যাতে সবগুলো মিলে একটা তালে পরিণত হয়। হারুন [আ.] সমবেত লোকদের বললেন, ‘মুসা ফিরে এসে এই স্বর্ণ সম্পর্কে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’ স্বর্ণ সেভাবেই জ্বলতে লাগলো।

এ সময় সামেরি তার মুষ্ঠিবদ্ধ হাত হারুন [আ.]-কে দেখিয়ে বললো, ‘আমিও কি এগুলো নিক্ষেপ করবো?’ হারুন [আ.] মনে করলেন তার হাতেও হয়তো মিসরীয়দের কোনো অলঙ্কার রয়েছে, তাই তিনি তা নিক্ষেপ করতে আদেশ দিলেন। সামেরি বললো, ‘আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হোক’ আপনি আমার জন্যে এ মর্মে দোয়া করলেই শুধু আমি নিক্ষেপ করবো, নয়তো নয়। আপনি আমার জন্য এমন দোয়া করুন!’

সামেরির কপটতা ও কুফর হারুনের জানা ছিলো না। তাই তিনি দোয়া করলেন। তখন সে তার হাতের বস্তু আগুনে ছুঁড়ে ফেললো। তার হাতে আসলে কোনো অলঙ্কার ছিলো না, ছিলো ফেরেশতা জিবরাইলের পায়ের নিচের কিছু মাটি। এর আগে সে এক বিস্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলো- জিবরাইল [আ.] যখন নবি মুসার সঙ্গে সাক্ষাত করতে আসেন তখন জিবরাইলের বাহনের পা মাটিতে যেখানে পড়ে সেখানে তৎক্ষনাৎ ঘাস উৎপন্ন হয়। এতে সে বুঝে নিয়েছিলো এটার পায়ের নিচের মাটিতে জীবনের স্পন্দন নিহিত আছে। নিতান্ত কৌতূহলবশে সে ওই মাটির কিছুটা সংগ্রহ করে নিজের কাছে রেখেছিলো।

হারুন [আ.] যখন ওই স্থান পরিত্যাগ করলেন তখন সামেরি উপস্থিত অন্যান্যদের সহায়তায় ওই গলিত স্বর্ণ দিয়ে গো-বৎসের আকারে (মিসরীয় দেবতা ওপিষ) এক দেবতা তৈরি করলো। আগুনে সামেরির নিক্ষিপ্ত জিবরাইলের অশ্বের পদতলের মাটির গুণে এই দেবমূর্তি জীবন্ত গরুর মতো আচরণ ও হাম্বা স্বরে ডাকতেও লাগলো। সামেরি তখন সেখানে উপস্থিত ইসরাইলিদের বলতে লাগলো, ‘এ-ই হলো খোদা। মুসা এঁর সাথে কথা বলতে তুর পাহাড়ে গেছেন, আর এদিকে ইনি সশরীরে এখানে এসে হাজির হয়েছেন।’

সামেরির এ কথা শুনে চরম অবাধ্য ইসরাইলি ইহুদি সম্প্রদায় বিপুল উৎসাহের সাথে সেটার পূজা-অর্চনা শুরু করে দিলো। ধীরে ধীরে প্রায় পুরো বনি ইসরাইল সম্প্রদায়ের মাঝে এই বাছুরের পূজা একটি ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হলো এবং সামেরি তাদের নতুন পুরোহিত সেজে বসলো। হজরত হারুন [আ.] তাদের নানাভাবে এই অলৌকিক বাছুরের পূজা করতে নিষেধ করলেন, কিন্তু সীমালংঘনকারী ইহুদিরা বরং তাকেই অধার্মিক বলে গালমন্দ করতে লাগলো। মুসা [আ.] তুর পর্বত থেকে সিনাই উপত্যকায় ফিরে নিজ সম্প্রদায়ের এমন অবাধ্যতা দেখে তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করেন এবং সামেরিকেও ‘অস্পৃশ্য’ ধরনের এক যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেন।

আল কুরআনে সুরা বাকারার ৫২-৫৪, সুরা আরাফের ১৪৯-১৫৪, সুরা ত্বহার ৮৬-৯৮ নং আয়াতে এ বিষয়ে আলোচনা এসেছে। সমস্ত তাফসিরগ্রন্থেই বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top