আউটসোর্সিংয়ে ন্যূনতম মজুরি হবে সাড়ে ৭ হাজার টাকা

সরাসরি কর্মী নিয়োগ না করে আউটসোর্সিংয়ের (বাইরের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দিয়ে চুক্তিভিত্তিক কাজ করানো) প্রবণতা বাড়ছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ, গাড়ি চালনাসহ অনেক কাজেই এ পদ্ধতি জনপ্রিয় হচ্ছে। গড়ে উঠছে অনেক প্রতিষ্ঠানও। কিন্তু আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা মজুরি পান অনেক কম। চাকরির নিশ্চয়তা ও অন্যান্য সুবিধাও নেই। তাই সরকার এ সেবা খাতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু কালের কণ্ঠকে বলেন, দিন দিন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোকবল নিয়োগ বাড়ছে। তবে এ পদ্ধতিতে নিয়োগপ্রাপ্তদের বেতন খুব কম। এই কম বেতন থেকেও একটা অংশ কেটে রাখে সংশ্লিষ্ট আউটসোর্সিং কম্পানি। আরো কিছু কাটাকাটির পর আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের হাতে মাস শেষে যা আসে খুবই কম। তাই সরকার এসব শ্রমজীবীর জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে দেবে। এই ন্যূনতম মজুরি সাত হাজার ৫০০ টাকা হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে আইটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অনেকের কাজের সুযোগ তৈরি হলেও তাঁদের কম মজুরির বিষয়টি শ্রম মন্ত্রণালয়ের নজরে এসেছে। আউটসোর্সিং কম্পানিগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পর্যাপ্ত অর্থ নিলেও কর্মচারীদের খুব কম বেতন দেয়। এর থেকে আবার একটা অংশ কেটে রাখে সংশ্লিষ্ট কম্পানি। এরপর হাতে যা থাকে তা দিয়ে মাস চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ার পর তাঁদের সঙ্গে আউটসোর্সিং কর্মীদের বেতন ব্যবধান আরো বেড়ে গেছে।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি আউটসোর্সিং সংস্থাকেও সরকারি দপ্তরে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনবে সরকার। এ লক্ষ্যে ২০১৩ সালের শ্রম আইনের আলোকে শ্রম বিধিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে, যা শিগগিরই চূড়ান্ত করা হবে। এ বিধিমালায় আউটসোর্সিং শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চারদিকে ব্যাঙের ছাতার মতো আউটসোর্সিং কম্পানি গড়ে উঠছে। সরকারি কোনো সংস্থা এসব কম্পানির কাজ তদারকি করে না। তারা শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানেই কর্মচারী সরবরাহ করে না, বেসরকারি এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও কর্মচারী সরবরাহ করে। এসব কর্মচারীর চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই, নেই উৎসব ভাতাও। গ্রাচ্যুইটি, পেনশনসহ চাকরির অত্যাবশ্যকীয় সুযোগ-সুবিধাও তাঁরা পান না। বাংলাদেশে মজুরি নির্ধারণের জন্য চার ধরনের কাঠামো রয়েছে। সরকারি আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে জাতীয় পে কমিশন। মজুরি কমিশন সরকারি খাতে পরিচালিত কল-কারখানার শ্রমিকদের মজুরি ঠিক করে। ন্যূনতম মজুরি বোর্ড বেসরকারি খাতে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর মজুরি নির্ধারণ করে ৪৩টি সেক্টরের জন্য। এ ছাড়া ওয়েজ বোর্ডের মাধ্যমে সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো ঠিক করা হয়। আউটসোর্সিং কম্পানির শ্রমিকদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ করবে মজুরি কমিশন।

একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের রাজধানীর কলাবাগানের এটিএম বুথে কাজ করেন শরীফউদ্দিন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে রপ্তানিমুখী একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতাম। কিন্তু লেখাপড়া শিখে পোশাক কারখানায় কাজ করাটাকে মা-বাবা ভালোভাবে নেননি। মাঝখানে কারখানাটি পুড়ে যায়। পরে চাকরি হারিয়ে একটি আউটসোর্সিং কম্পানিতে নাম লেখাই। তারা এই এটিএম বুথে চাকরি দিয়েছে। মাসে বেতন পাঁচ হাজার টাকা। এর মধ্যেও আবার নানা কথা বলে টাকা কেটে নেয়। এ টাকায় কী হয়। তার পরও বেকার বসে না থেকে চাকরিটা করছি।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, যে ক্ষেত্রের শ্রমিকের কথাই বলা হোক না কেন, মাসে কোনোমতে খেয়ে পরে চলতে কমপক্ষে ১৩ হাজার টাকা প্রয়োজন। তা হলে প্রশ্ন, এত কম বেতনে একজন মানুষের চলে কিভাবে? কম বেতনের শ্রমজীবীরা আসলে বেঁচে আছে কোনো মতে। শ্রমিক বা কম বেতনের কর্মচারী মানে পুষ্টিহীন ভগ্ন স্বাস্থ্য, তোবড়ানো গাল, বসে যাওয়া চোখ, রুক্ষ-বিষণ্ন মুখ। তাঁদের সন্তানের শিক্ষা নেই। প্রতিবছর এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলেই এটা বোঝা যায়। ক্লাস ফাইভে পিএসসি পরীক্ষা দেয় ৩০ লাখ। আর এসএসসিতে বসে ১৪ লাখ ছাত্রছাত্রী। এ-পর্যায় থেকে ঝরে পড়ল ১৬ লাখ ছাত্রছাত্রী। এরা কারা? এরা এসব শ্রমজীবীর সন্তান।

– See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/news/2015/08/16/256953?utm_source=vuukle&utm_medium=referral#sthash.cgS2KYE6.dpuf

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top