প্রায় চার দশক পর মমতাময়ী সেই সেবিকাকে খুঁজে পেল কোলের ‘শিশুটি’

নিউ্ ইয়র্কের অ্যালবানি মেডিক্যাল সেন্টার কতৃক ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত এই ছবিটিতে দূর্ঘটনায় আগুনে পুড়ে যাওয়া তিন মাস বয়সী আমান্দা স্ক্যারপিনাটিকে হাসপাতালের শিশু কেবিনে পরম মমতায় বাহুডোরে জড়িয়েছেন সেবিকা সুসান বারগার। ছবি: কার্ল হোওয়ার্ড/ অ্যালবানি মেডিক্যাল সেন্টার (এপি থেকে সংগৃহীত) (প্রিয়.কম): গজ দিয়ে জড়ানো শিশু আমান্দা স্ক্যারপিনাটির ছোট্ট মাথা। চোখ জোড়া জ্বলজ্বল করছিল। মাথা থেকে থুতনি পর্যন্ত আগুনে পুড়ে যাওয়া তিন মাস বয়সী শিশুটিকে আলগা করে পরম মমতায় নিজের কোলে জড়িয়ে নেন এক সেবিকা। ১৯৭৭ সালে হাসপাতালের বার্ষিক প্রতিবেদনে অ্যালবানি মেডিক্যাল সেন্টার আগুনে দগ্ধ ছোট্ট শিশু স্ক্যারপিনাটিকে পরম মমতায় আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখা অজ্ঞাত সেবিকার ঐ ছবি প্রকাশ করে। এরপর কেটে গেছে অনেক বছর।

কোলের সেই শিশু স্ক্যারপিনাটিও আর শিশু নেই। নিজ বাড়িতে বাষ্পীয়করণ যন্ত্রের বিস্ফোরণে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া তিন মাস বয়সী স্ক্যারপিনাটির ঐ ছবিটির বয়স কয়েক দশক হয়ে গেছে। ৪০ বছরের পুরনো ছবিটিতে থাকা ঐ সেবিকারও কোন হদিস পাওয়া্ যাচ্ছিল না। তবে অনেক চেষ্টার পর সম্প্রতি মিলন হয় তাদের। জড়িয়ে ধরেন একে অপরকে। হাসপাতালস্থ হওয়া স্ক্যারপিনাটির ভয়াবহ ঐ দুর্ঘটনাটি তার বাড়িতে ঘটে। তিন মাস বয়সে স্ক্যারপিনাটি অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং সেসময় তাকে দোলনায় শুইয়ে রাখা হয়। ব্যাথা উপশমের জন্য মেনথলের মলমও লাগানো হয়। দোলনা থেকে দুর্ভাগ্যবশত মেঝেতে গরম হওয়া বাষ্পকারকে উপরে পড়ে যান তিনি। সম্প্রতি ফেসবুকে পোস্টকৃত এক স্ট্যাটাসে একথা জানান তিনি। বার্তা সংস্থা এপি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী বাষ্পকারকের গরম ভাপে পুড়ে যায় মেনথলের মলম লাগানো স্ক্যারপিনাটির ত্বক।

সার্জারির বছরখানেক পর ছোট্ট কালের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় পাশে থাকা ঐ সেবিকার একটি ছবি দেখেছিলেন তিনি। সম্প্রতি ৩৮ বছর বয়সী স্ক্যারপিনাটি সংবাদ সংস্থা এপি’কে দেওয়া এক সাক্ষাতাকারে বলেন, ‘আগুনে পুড়ে ‍বিকৃত হয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে শৈশব কাটানোর সময়গুলোতে আমাকে ভৎসনা করা হত। আমি প্রায়ই ঐ ছবিগুলো দেখতাম এবং তার সাথে কথা বলতাম যদিও জানতাম না সে কে। ঐ সময়ে পরম মমতায় আমাকে জড়িয়ে নেওয়া সেবিকাকে ছবিতে দেখে আমি প্রশান্তি পেতাম। ঐ ঘটনার ২০ বছর পর স্ক্যারপিনাটি অজ্ঞাত ঐ নারীকে খোঁজার চেষ্টা করেন কিন্তু ব্যর্থ হন। কয়েক দশক চলে যায়। স্ক্যারপিনাটি অজ্ঞাত নারীকে আবারো খোঁজার চেষ্টা করেন। আর এইবার মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক ব্যবহার করেন। এই মাসের প্রথম দিকে এক সহজাত অজুহাতে ফেসবুকে একটি ছোট্ট বার্তা পোস্ট করেন তিনি। স্ক্যারপিনাটি লেখেন, ‘আমি তার নাম জানতে উৎসুক এমনকি সুযোগ পেলে তার সাথে দেখা ও কথাও বলতে চাই আমি। দয়া করে পোস্টটি শেয়ার করবেন কেননা আপনি নিজেও জানেন না এটা কার কাছে পৌঁছাবে।’

স্ট্যাটাসটি ফেসবুকে পোস্ট হওয়ার পর অন্তত ১ হাজার মানুষ সেটি শেয়ার করে। অবশেষে তার ঐ বার্তায় সাড়া পড়ে যায়।    অ্যালবানি হাসপাতালের আরেক সেবিকা অ্যাঞ্জেলা লেয়ারি শিশু কোলে থাকা ঐ সেবিকাকে চিনতে পারেন। ৩৫ বছরেও লেয়ারি এ ব্যাপারে সেবিকা সুসান বারগারের সাথে কথা বলেননি তবে সে তৎক্ষণাৎ ছবিটি দেখে তাকে চিনতে পারেন। ছবিটিতে দেখা সেবিকাকে চিনতে পেরে লেয়ারি ফেসবুকে স্ক্যারপিনাটিকে বার্তা পাঠান। বার্তাতে তিনি বলেন, ‘এই ছবির মতই তিনি অনেক মধুর ও য্ত্নবান। সে তার এই সেবিকা জীবনকে ভালোবাসে এবং শিশু-বৃদ্ধ সবাইকেই সমান যত্ন করে।’

লেয়ারি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে বারগারের তথ্যাদি প্রকাশ করতে সহায়তা করেন। আর ঐ তথ্যের মাধ্যমেই তাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়। কিছুদিন পরই স্ক্যারপিনাটি বারগারের সাথে ফোনে যোগাযোগ করেন। স্ক্যারপিনাটি তার ফেসবুক পেজে লেখেন, ‘এই এত বছর পর এসে ভাবিনি যে আমি তাকে দেখতে পাব। আমার কল্পনার মতনই সে মধুর এবং যত্নশীল।’ সেসময় অর্থ্যাৎ ১৯৭৭ সালে বারগারের বয়স ছিল ২১ বছর। সদ্য কলেজ পাস বার্গার অ্যালবানি মেডিক্যাল সেন্টারের শিশু বিভাগে সেবিকা হিসেবে যোগ দিয়েছেন।

বার্গার এপি’কে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, ‘আমার ওর কথা মনে আছে। সে অনেক শান্ত স্বভাবের ছিল। সাধারণত সার্জারির করার পর শিশুরা কাঁদে নয়তো ঘুমায়। কিন্তু সে আমার কোলে অনেক আশ্বস্ত ও চুপচাপ ছিল। এটা অসাধারণ ছিল।’ সাম্প্রতিককালে নিউ ইয়র্কের ক্যাজিনোভিয়া কলেজের নির্বাহী সহ-সভাপতি বার্গারের কাছে এমন পুনর্মিলন অপ্রত্যাশিত ছিল। স্ক্যারপিনাটির ভাষ্যানুযায়ী, বার্গারও ছবিটি বছরের পর বছরের নিজের কাছে রেখেছিলেন। তবে ছোট্ট কন্যা শিশুটির কি হয়েছিল তা সম্বন্ধে স্বভাবতই তিনি অবগত ছিলেন না।

বারগার এপি’কে বলেন, ‘আমি জানি না কয়জন সেবিকা এ ধরনের ঘটনার অংশ হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। যে কেউ একজন আপনাকে সারা জীবন রাখবে। বছরের পর বছর ধরে তাকে সেবা করা অন্য সব সেবিকার প্রতিনিধিত্ব করতে আমার নিজেকে বিশেষ সুবিধার অধিকারী বলে মনে হচ্ছে।’ নিউ ইয়র্কের অ্যালবানি মেডিক্যাল সেন্টার কর্তৃক মঙ্গলবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সেবিকা সুসান বারগার (বামে), আমান্দা স্ক্যারপিনাটি (ডানে) একে অপরের সাথে মোলাকাত করছেন। ছবি: মাইক গ্রল/ এপি  সূত্র: দি ওয়াশিংটন পোস্ট

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top