একটা মালা নিবেন ছার

শীতের এই মধুর বিকেলে ঘুরতে বের হয়েছেন। অনেক কষ্টে বের করা এক চিলতে সময় যেন জোর করেই কেটে যাচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত জ্যামে। অতিষ্ট হয়ে যখন ক্লান্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে আপনার গাড়ির জানালায় কেউ একজন এসে ফিরে গেল। তার এক মুহূর্ত পর অপর এক ফুলওয়ালী বাচ্চা মেয়েটি জানালার কাচে টোকা দিয়ে বলে উঠলো ‘ছার একটা মালা নিবেন, ম্যাডামরে দিয়েন। গেন্দা ফুলির মালা আছে। বকুল ফুলির মালাও আছে, নেন না ছার’।

কথা শেষ না হতেই পাশ থেকে আরেকজন, ‘ছার আমারটা নেন দাম কমিয়ে নেব’।

ফুলের দাম কত? এক আটি ৫০ টাকা ছার। বকুলমালা ৩০ টাকা, গেন্দা মালাও ৩০ টাকা। এবার ফুল বিক্রেতা ছেলে-মেয়েদের ভেতর বেধে যায় হট্টগোল। একজন বলে আমারটা অপরজন বলে ছার আমারটা নেন। না স্যার আমি আগে কইছি, আমারটা নেন। আরেকজন এসে স্যার একটা বেলুন নেবেন? নেন ছার।

এভাবে দিনের পর দিন রোদ কিংবা বৃষ্টিতে ওরা রাস্তায় জ্যাম বাধলেই গাড়ির ভীড়ে, দুই গাড়ীর চিপায় চেঁচাতে থাকে ‘ফুল নিবেন স্যার ফুল, তাজা ফুল আছে’। রাজধানীর খামারবাড়ি থেকে মিরপুর রোডে সংসদের পাশ দিয়ে এমন অসংখ্য শিশুদের ফুল বিক্রি করতে দেখা যায়। এছাড়া ফার্মগেট থেকে খামারবাড়ি, বিজয় সরণি থেকে মহখালী রোড। ওরা তাকিয়ে থাকে কখন জ্যাম বেধে গিয়ে গাড়ীর লম্বা লাইন দাঁড়িয়ে যাবে। আর তখনই ফুল-বেলুন নিয়ে দৌঁড়াদৌড়ি শুরু।

ফুল বিক্রেতা মুক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তার বেঁচে থাকার যুদ্ধের কথা। মুক্তি বলে- পড়ালেখায় টাকা দরকার হয়। বাবা-মাকে হারিয়ে এতিম মুক্তির আকুতির কথা- ‘কে টাকা দেবে? সারাদিন ফুল বিক্রি করলে থাকে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। তা দিয়েই ভাত কিনে খাই। ময়লা ভাত খাই ছার।’

হঠাৎ পুলিশের সিগন্যাল, গাড়ি স্টার্ট নিয়ে নিল। চোখের পলকে রাস্তা ছেড়ে ফুটপাতে আশ্রয় নিল মুক্তি। এমন হাজারো মুক্তির নানা আকুতির কথায় বুকে নাড়া দিয়ে গেলেও যেন নিরব দর্শক আমরা।

এরা কি সুবিধাবঞ্চিত শিশু নয়? রাষ্ট্রের নাগরিক নয়? যদি আমরা সব প্রশ্নের উত্তর দিই তবে আমাদের ওপর ওদের দায় এসে পড়ে। তাই আমতা আমতা করে উত্তর না দিয়েই ছেড়ে যাওয়া। মুক্তিকে রোদ, বৃষ্টি আর কনকেনে শীতে ফুটপাতে রেখেই আমাদের এসি গাড়িতে চেপে বসা।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top