ইচ্ছের শক্তি আর মনোবল দিয়ে শুন্য থেকে সফলতার চুড়ায় পৌছানো এক মুসলিম নারী রাজনীতিবিদের গল্প !

নিজের ইচ্ছের চেয়ে বড় শক্তি পৃথিবীতে কিছুই নেই। হতাশায় ভুগে বরাবরই আমরা  যারা ভাগ্যের দোষদিয়ে থাকি তাদের জন্য ইচ্ছের অদম্যশক্তি আর আকাংখার বাস্তবায়নের গল্পগুলো প্রেরনা যুগিয়েছে যুগে যুগে। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, মেধা, পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর যোগ্যতায় মানুষ কিনা করতে পারে। মেঠোপথ থেকে উঠে আসা জীবনজয়ী এসব মানুষের দেখানো আলোর পথ কোটি কোটি স্বপ্নশিকারী তারুণ্যের জন্য অনুপ্রেরণা, শক্তি, সাহস আর দীপ্ত মনোবলের এক অনুপম দৃষ্টান্ত।

জীর্ন কুড়ে ঘরে  জন্মের পর খেয়ে না খেয়ে দিন কাটিয়ে গ্রামের মানুষের কাছ থেকে সাহায্য তুলে আমাদের দেশেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়ে যাওয়া রাখাল বালক ড আতিউর রহমানদের মত খেয়াঘাটের মাঝির সন্তান, শৈশবের এক পত্রিকার হকার থেকে ভারতের প্রেসিডেন্ট আব্দুল কালাম কিংবা কেনিয়া থেকে ইমিগ্রান্ট হয়ে আসা এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান আর ইন্দোনেশিয়ার মক্তবে শৈশব কাটানো আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আর মরক্কোর রাখাল বালিকা থেকে ফ্রান্সের প্রথম মহিলা শিক্ষামন্ত্রী নাজাত-এদের জীবন কাহিনী যেন রুপকথার গল্পকেও হার মানায়।

ইচ্ছের শক্তি দিয়ে যারা জীবনে সফলতার চুড়া স্পর্শ করতে চায়, তাদের জন্য আজ থাকছে শুন্য থেকে উঠে এসে সফলতার চুড়ান্তে পৌছানো এক নারীর গল্প।

নাজাদ ভালাউদ বেলকাসেম নামের এই তরুনী  ফ্রান্সের একজন সফল ও আলোচিত রাজনীতিবিদ। ২০১৪ সালের ২৫শে আগস্ট তাকে প্রথম শিক্ষামন্ত্রীর আসনে বসানো হয়। শুধু কি তাই ! ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে কমবয়সী এবং একমাত্র মুসলিম মিনিস্টার এই তরুনীই ।

 

সাত ভাই-বোনের মাঝে তিনি পরিবারে দ্বিতীয় সন্তান। তিনি মরক্কোর নি চিকার নামের একটি ছোট্ট গ্রামে মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার নানী ও দাদী ছিলেন স্প্যানিশ ও আলজেরিয়ান নাগরিক। তার বাবা একজন দরীদ্র নির্মাণ শ্রমিক ছিলেন। মাত্র ৫ বছর বয়সে নাজাদ নামের ঐ শিশু ১৯৮২ সালে তার বাবার সাথে নির্মান শ্রমিকের কাজ শুরু করেছিলেন দুমুঠো খাবার যোগাড় করতে  সাথে গ্রামের মাঠে মেষ পালনও  করতেন তিনি । সেখানে তার মা এবং বড় বোন ফাতিহাও কাজ করতেন। কাজের পাশাপাশি সেই শিশুটি তার পড়াশোনা চালিয়ে যান নিরলসভাবে ।

শৈশব থেকেই দারীদ্রের নানান কষাঘাতে জর্জরিত নাজাতের জীবন ও যুদ্ধ সত্যি  রূপকথার গল্পের চেয়েও  বেশী রোমাঞ্চকর হয়তো । ১৯৭৭ সালের ৪ অক্টোবর উত্তর মরক্কোর এক পাহাড়ী অঞ্চলে নাজাতের জন্ম। যেখানে মানুষের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন হচ্ছে মেষপালন। সাত ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় নাজাতের বেড়ে ওঠাও মেষ প্রতিপালন করে। এমনি ভাবেই মরক্কোর এক দরিদ্র মুসলিম পরিবারে স্বাভাবিক নিয়মে কাটছিলো তাঁর শৈশবের জীবন।এসময়  ফ্রান্সে শুরু হলো এক ইমিগ্রান্ট মুসলিম পরিবারের নতুন সংগ্রামমূখর অধ্যায়। সেই সুবাদেই নাজাতের পরিবার  ফ্রান্সে চলে আসেনতুন জীবনের আশায় ।

মাঝখানের উত্থান-পতনের গল্পটাও বেশ দীর্ঘ । প্রাথমিক স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের জীবনে দারুণ সংগ্রাম করতে হয় নাজাতকে। প্রতিটি স্কুলে অসাধারণ সব রেজাল্ট করে মেধাবী নাজাত পার হতে লাগলো সাফল্যের একেকটি ধাপ। ২০০২ সালে প্যারিসের রাজনৈতিক ইন্সটিটিউট থেকে তিনি স্নাতক পাশ করে ডিপার্টমেন্টের সেরা ছাত্রী হিসাবে গ্রাজুয়েশন এবং রাষ্ট্রীয় সম্মানজনক পদক লাভ করেন একই সাথে নাজাত ।

স্নাতক পাশের পরই উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি ২০০৩  সাল থেকে মূলত তিনি রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত হন। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তার। নিজের দক্ষতা, দুরদর্শিতা আর সাংগঠনিক ভাবনায় নজর কাড়েন সবার। সিনেমার গল্পের মতই বদলে যেতে থাকে রাজনীতির প্রেক্ষাপট। এরপর ২০০৪ সালে ফ্রান্সের কালচার কমিউনিকেশানের  চেয়ারম্যান এবং ২০০৫ সালে সোশ্যালিস্ট পার্টির  এ্যাডভাইজার হিসাবে যোগদান। রাজনৈতিক জীবনেই বোরিস ভালাউদ নামের এক রাজনিতিবিদের সাথেই তিনি ২০০৫ সালের ২৭শে আগস্ট বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৫৮.৫২% ভোট পেয়ে কন্স্যুলার জেনারেল নির্বাচিত হন ।
এরপর প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ১৬ই মে ২০১২ সালে  মিনিস্টার অব উইম্যান রাইটস হিসাবে মন্ত্রীপরিষদে নাজাতকে নিয়োগ দেন। এরপর নারীদের অধিকার পুনর্বাসনে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে ২৫ শে আগস্ট ২০১৪ সালে  তিনি ফ্রান্সের প্রথম মহিলা শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ পান। একের পর এক সকল বাঁধা পেরিয়ে আজ তিনি ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী।

তথ্যসূত্র

Image

বামপাশের ছবিটিতে মরক্কোর অতি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে নাজাতের শৈশবের  ছবি। ডানপাশে সেই নাজাতই আজ ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top