উপাচার্যের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইইউটিতে আন্দোলন, শিক্ষার্থীদের সমাবর্তন বর্জন

ঢাকার গাজীপুরে অবস্থিত আইইউটি (ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি) ও আই সি (Organization of Islamic Cooperation) পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য ও আই সি থেকে যেমন অনুদান আসে তেমনি সরকার থেকেও তারা অনুদান পেয়ে থাকে। সম্প্রতি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএসসি প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

আইইউটিতে বিএসসি প্রোগ্রামে দুইটি ভাগে ছাত্র ভর্তি হয়। একটি অংশ হল রেগুলার ফাইন্যান্স স্কিম যাতে শিক্ষার্থীরা ওআইসি থেকে বৃত্তি পায়। এদের সংখ্যা ১০০ থেকে ১২০ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। মেধাতালিকার ক্রম অনুসারে এদের নেওয়া হয়। আরেকটি অংশ হল সেলফ ফাইন্যান্স স্কিম। প্রথম ১০০ বা ১২০ জন এর পর এদের নেওয়া হয়। এরা ওআইসি থেকে বৃত্তি পায় না। এ দুইটি স্কিমের মধ্যে পার্থক্য হল অর্থের পরিমাণের। এ দুইটি স্কিমের ছাত্রদের জন্যই হলে জায়গা বরাদ্দ থাকে।

15272315_10211381229994899_8394443909237389767_o

এবার ভর্তি পরীক্ষার আগে আরো দুইটি ক্যাটাগরি খোলা হয় এবং শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আবাসিক ও অনাবাসিক নামে দুইটি ক্যাটাগরি তৈরি করা হয়। যারা অনাবাসিক তাদের টাকার পরিমাণ কম হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয় এবং তাদের জন্য পরিবহণের ব্যবস্থার কথা বলা হয়।
প্রতিদিন ঢাকা থেকে গাজীপুরের বোর্ডবাজারে এসে ক্লাসে উপস্থিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি জটিল ও ক্লান্তিকর বিষয়। পূর্বে হরতাল, যানজট কিংবা অন্যান্য দুর্যোগের কারণে আইইউটির ক্লাস বন্ধ/ বিঘ্নিত না হলেও এবার সে সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যা পরবর্তীতে সেশন জটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব কারণে অনাবাসিক ক্যাটাগরি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে।
অনিয়ম বা অস্বচ্ছতার অভিযোগও ভর্তি কার্যক্রমের প্রথম থেকেই উঠে আসে। আইইউটিতে প্রতি বছর সাধারণত এসএসসি ও এইচএসসি দুইটি পরীক্ষাতেই সব বিষয়ে জিপিএ ফাইভ পেয়ে কিংবা নির্দিষ্ট এক দুইটি বিষয়ে জিপিএ ফাইভ না পেয়ে পরীক্ষা দেওয়া যায়। কিন্তু এবার প্রথমে এমন নিয়ম বহাল থাকলেও পরীক্ষার কিছুদিন আগে ঘোষণা দেওয়া হয় এবার সকল আবেদনকারী ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। এতে যারা আগের নিয়মের কথা ভেবে আবেদন করে নি তারা হতাশার মধ্যে পড়ে যায়।
এরপর অনিয়ম দেখা যায় ভর্তি পরীক্ষা পরবর্তী কার্যক্রমে। প্রতিবছরের মত এবারও ভর্তি পরীক্ষার ব্রুশার ও বিজ্ঞাপনে ১১০ জন বাঙালি ছাত্র রেগুলার স্কিমে ভর্তির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বিষয় নির্ধারণ ও রেগুলার কিংবা সেলফ বিভাগ নির্ধারণ করে দেওয়ার পর হঠাৎ ঘোষণা আসে এবার মাত্র ৭০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী রেগুলার স্কিমে শিক্ষার্থী ভর্তি হবে। এতে করে অনেক ভর্তি পরিক্ষার্থী সমস্যার মধ্যে পড়ে। কারণ যারা টাকার কথা চিন্তা করে সেলফ স্কিমের জন্য আবেদন করেনি যেমন ১০০ এর আশেপাশে তারা মারাত্মক হতাশ হয়ে পড়ে এমন হয়ে এবং অনেকেই নিশ্চিত ছিল রেগুলার স্কিমে সুযোগ পাবে তারাও এ ঘোষণা অনুযায়ী সেলফে পড়ে যায়। এদের অনেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনের অপেক্ষা না করে আইইউটির জন্য অপেক্ষায় ছিল বলে জানা যায়। সে মূহুর্তে এ ঘোষণা সত্যিই হৃদয়বিদারক।
এখানেই শেষ নয়, একই নির্দেশে বলা হয় এই ৭০ জনের মধ্যে ৫৮ জন্য সরাসরি রেগুলার বিভাগে ভর্তি হতে পারলেও ১২ জন ভর্তি হতে হবে ভাইস চ্যান্সেলরের ইচ্ছাতে! যাকে নাম দেওয়া হয় need aware scholarship. এ ১২ জনকে কীভাবে নির্বাচন করা হবে তা নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ স্বচ্ছতার অভিযোগ রয়েছে।

 

এসবের সাথে আবার যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত ১০০ ডলার ফি। ভর্তি কার্যক্রমের তালিকায় এই ১০০ ডলার কি কাজে লাগবে তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এই ১০০ ডলারকে কর্তৃপক্ষ প্রসেসিং ফি হিসেবে দেখিয়েছে।
হঠাৎ করে শিক্ষার্থী বাড়ানো হলেও হলে সিট সংখ্যা সীমিত থাকায় ভর্তিকৃত সব শিক্ষার্থীকে আসন দেওয়া সম্ভব নয়। হলে খালি আসন আছে ২২০ টি। ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সেলফ স্কিমের ১০০ জন ও রেগুলার স্কিমের ৭০ জন শিক্ষার্থীরা হলে আসন পাবে । কিন্তু সেলফ স্কিমের শিক্ষার্থীরা কিভাবে হলে আসন পাবে তার কোন সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয় নি।
এবছরের রেগুলার ও আবাসিক বিভাগে মোট চার বছরের জন্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৫০০ ডলারের সমমূল্যের বাংলাদেশী টাকা। রেগুলার ও অনাবাসিকদের জন্য ৫০০ ডলার সমমানের বাংলাদেশী টাকা।
একইভাবে সেলফ ও আবাসিক বিভাগে মোট চার বছরের জন্য ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭০০০ ডলার এবং সেলফ ও অনাবাসিক বিভাগের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১২৫০০ ডলার সমমানের বাংলাদেশী টাকা।

এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে আই ইউ টির বর্তমান ও পূর্বের শিক্ষার্থীরা বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর ড. মুনাজ আহমেদ নূর ও কর্তৃপক্ষকে দায়ী করছে এবং তাদের মধ্যে এ নিয়ে কয়েকদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এর ফলস্বরূপ, বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বছরের বিদায়ী ব্যাচ (ব্যাচ’১২) এ অনিয়মের কারণ দর্শানো ও তার সমাধানের জন্য ৩০শে নভেম্বর কর্তৃপক্ষ বরাবর একটি চিঠি প্রেরণ করে। চিঠিতে তাদের দাবিগুলো ছিল-

১) ভর্তি কার্যক্রমে অতিরিক্ত ১০০ ডলার প্রত্যাহার
২) প্রতিবারের মত এবারও রেগুলার স্কিমে ১১০ জন বাংলাদেশি সংখ্যা বহাল রাখা
৩) “need aware scholarship” নামে ১২ জন ভর্তির নিয়ম বাতিল করা ও মেধার ভিত্তিতে সকল শিক্ষার্থীকে ভর্তির সুযোগ দেওয়া
৪) অনাবাসিক বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধকরণ। (কেবলমাত্র ছাত্রীদের জন্য এ বিভাগ রাখা যেতে পারে। কারণ ছাত্রী হলের কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয় নি।)

এ চিঠির যথাযথ উত্তর না পেলে ২রা ডিসেম্বর শিক্ষার্থীরা দুপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। তারা স্লোগান ও শান্তিপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে ভাইস চ্যান্সেলরকে তাদের সামনে এসে কারণ দর্শানোর আহ্বান জানায় এবং একই সাথে তারা দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতি প্রতিবাদ জানায়। শিক্ষার্থীরা বিকাল ৫:১৫ পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে। তারা কোন আলোচনায় যাওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। তারা জানায়, দাবিগুলো মানা হয়েছে না হয় নি কেবল সেটার উত্তরই তারা চায়। ৫.১৫ এর মধ্যে ভাইস চ্যান্সেলর তাদের সম্মুখীন না হলে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের স্থান ত্যাগ করে এবং তাদের পরবর্তী প্রতিবাদস্বরূপ বিদায়ী ব্যাচ তাদের সমাবর্তন বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেয় যা ৮ই ডিসেম্বর আইইউটি ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হবার কথা এবং এ সমাবর্তনে প্রধান অতিথির আসন গ্রহণ করবেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ প্রায় ২০ টি দেশের রাষ্ট্রদূতগন।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top