দুশ্চিন্তা নয়, চিন্তা করো

২০১৫ সালের সব শিক্ষার্থীকে অভিনন্দন। আমি তোমাদের সামনে দাঁড়াতে পেরে সম্মানিত বোধ করছি। শিক্ষক-অভিভাবকসহ শিক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা জানাই। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কথা বলা নিশ্চয়ই দারুণ রোমাঞ্চকর ঘটনা। আমাদের সময় বক্তা ছিলেন অভিনেতা উইল ফেরেল। সেদিন আমরা বেশির ভাগই ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সেই বক্তব্য শুনেছিলাম। সেই ১২ বছর আগের ঘটনা আমার এখনো মনে পড়ে। সেই তখনকার মতোই আমি এখনো আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আমার কী হবে?
১৯৯৯ সালে আমি শিক্ষার্থী হিসেবে হার্ভার্ডের প্রাঙ্গণে পা রাখি। সেই সময় তোমরা বেশির ভাগই কিন্ডারগার্টেন স্কুলে মোজা পরে যেতে! সেই সময়টায় ভবিষ্যৎ নিয়ে যেভাবে চিন্তা করতাম, এখনো সেই চিন্তা করি। তখন করতাম দুশ্চিন্তা, আর এখন শুধুই চিন্তা।
জীবনটা আসলে নিজেকেই তৈরি করতে হয়। অন্যকে অনুসরণ বা অনুকরণ করে বেশি দূর যাওয়া যায় না। জ্ঞান-বুদ্ধি আর পড়াশোনার মধ্য দিয়ে নিজেকে বদলাতে হয়। পার্কে খেলার সময় শিশুরা তাদের বলের দিকে সব মন দিয়ে দেয়, তোমাদের ভবিষ্যতের দিকে সেভাবেই মন দিতে হবে। সাফল্য আসুক, না আসুক, সেই শিশুর মতো বল খেলে যাও।
আমি একটি পাবলিক হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছি। তখন মাত্র ইন্টারনেটের বিকাশ শুরু হয়েছে। অন্য সব কিশোরীর মতোই আমার হাইস্কুল জীবনটা ছিল ভীষণ এলোমেলো। এখন বুঝি সময়টা তখন রঙিন ছিল, কিন্তু আমার এলোমেলো কাজে রঙিন জিনিসই আমার কাছে বিরক্ত লাগত।
আমি ১১ বছর বয়স থেকে নিয়মিত অভিনয় করে যাচ্ছি। আমার কাছে তখন অভিনয় তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আমার পুরো পরিবার ছিল শিক্ষানুরাগী, যে কারণে আমাকে পড়াশোনাকে গুরুত্বের চোখে দেখতে হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা আর দুনিয়া নিয়ে ভাবনা আমার ধ্যানধারণা বদলে দেয়। আমার কাছে জীবন মানে অভিনয়, আর অভিনয় মানে মানুষের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া।
আমি ছোটবেলা থেকেই চাইতাম এমন কিছু করতে, যেখানে অন্যদের গল্প বলা যায়, শোনা যায়, দেখা যায়। নিজের থেকে কিছু করতে চাইতাম দেখেই অভিনয়ের দুনিয়াতে আমার পা রাখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আমাকে আমার দুনিয়াকে বড় করে দেখতে আর ভাবতে শিখিয়েছে।
আমাদের যে সবকিছুতে অভিজ্ঞ হয়ে কাজে নামতে হবে, তা ঠিক না। চেষ্টা করে যাওয়া, লেগে থাকার প্রত্যয় থাকলেই যেকোনো কাজে সফল হওয়া যায়। আমাদের সব বিষয়ে জ্ঞান না-ও থাকতে পারে, এই না থাকাটাকে শক্তি হিসেবে ধরে নিয়ে অনেক বড় কাজ করা যায়। নিজের মধ্যে যা নেই, তা নিয়ে না ভেবে, যা আছে তাই নিয়ে কাজে ডুবে যাওয়া উচিত সবার। ব্ল্যাক সোয়ান সিনেমা করার সময় আমাকে ভীষণ পরিশ্রম করতে হয়। ব্যালে নাচ নিয়েই ছিল সেই সিনেমা। আমি টুকটাক নাচ পারতাম, কিন্তু পেশাদার ছিলাম না। আমি যদি আমার সীমার মধ্যে কাজ করার চেষ্টা করতাম, তাহলে আমি ঝুঁকি নিতাম না, অভিনয় করতে চাইতাম না। আমি ঝুঁকি নিয়ে অভিনয় করি, আর সেই ঝুঁকির জন্যই আমি আমার জীবনের অন্যতম সম্মান অঅস্কার পুরস্কার জয় করি।
আমি কাজের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সঙ্গ উপভোগ করি। মানুষের সঙ্গে গল্প করলে, আড্ডা দিলে অনেক কিছু শেখা যায়, জানা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি অভিনয়ের সঙ্গে ভালো পড়াশোনা করার চেষ্টা করি। আমি নিউরো বায়োলজি আর হিব্রু সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। আমার মধ্যে সব সময় চেষ্টা করার মানসিকতা রাখি আমি। সাফল্য আসুক, না আসুক, আমি পরিশ্রম করে আনন্দ পাই। কাজের আনন্দ নিয়ে কাজ করতে হয়। সম্মান আর খ্যাতি নিয়ে ভাবলে কাজ করা হয় না। আমাকে এখনো অনেক সিনেমার জন্য অনেকেই প্রশংসা করে। আমি কিন্তু ভালো অভিনয়ের চেষ্টা করি, লেগে থাকার মানসিকতাই আমাকে ঘাড় উঁচু করে চলার শক্তি দেয়। নিজেকে তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। গুনে গুনে হিসাব করে কিছু করা যায় না। কাজ করতে হয় ঝুঁকি নিয়ে। নিজের দুনিয়াকে যারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তারাই সবচেয়ে বেশি জীবন উপভোগ করে। আমি আরেকটা কথায় বিশ্বাসী, অন্যের জীবন বদলে দেওয়ার মধ্যে অনেক আনন্দ আছে। আফ্রিকার শিশুদের শিক্ষার জন্য আমি কাজ করি, কত শিশুর জীবন বদলে গেছে, তা ভাবতেই আমার ভীষণ আনন্দ লাগে। মানব সভ্যতা কিন্তু এভাবেই সামনে এগিয়ে যায়। একে অন্যকে এগিয়ে না নিয়ে গেলে সভ্যতা সামনে এগিয়ে যেতে পারে না।
দার্শনিক আব্রাহাম জুসোয়া হেশেলের একটা কথা আমি সব সময় বিশ্বাস করি। ‘কী হবে আর কী না হবে’ তা প্রশ্ন না করে ‘কী করতে হবে আর কীভাবে করতে হবে’ তাই আমাদের ভাবতে হবে। আমি অপেক্ষা করব, তোমরা কীভাবে পৃথিবী বদলে দেবে, তা দেখার জন্য। সবাইকে ধন্যবাদ।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top