নারীবাদে কি সৌন্দর্যচর্চা নিষিদ্ধ

অ্যালিস ম্যাকঅ্যালেক্সান্ডার। একজন মার্কিন সমাজকর্মী। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীত্ব নিয়ে কাজ করেন তিনি। সম্প্রতি নারীবাদ আর সৌন্দর্যচর্চার সম্পর্কের নিরিখে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে একটি ব্লগ লিখেছেন তিনি। অ্যালিস মনে করেন, নারীবাদ মানে নারী যা চায়, যেভাবে থাকতে চায় তাকে তার মত থাকতে দেয়া। তাকে তার মত চলতে দেয়া। তার বিশ্বাসকে আঘাত করা নয়। অ্যালিসের সে লেখাটি প্রিয় পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল-

আমি এক গর্বিত নারীবাদী। এক কর্মজীবী নারী (যিনি বিয়ের পরও নাম পাল্টাননি)। একজন নারীবাদী পুরুষের (যিনি সারাক্ষণ পরিবারের নারী সদস্যদের আবহে থাকতে পছন্দ করেন) সন্তান আমি। এই দুটি মানুষ তাদের সন্তানদের এমনভাবে মানুষ করেছেন যেন লেবেল আঁটা শব্দটি উচ্চারণ করতে তারা লজ্জাবোধ না করে এবং শব্দটির সহজাত অর্থ বুঝতে চেষ্টা করে।

কখন নারীবাদী ছিলাম না কিংবা স্রোতে গা ভাসানো জাতীয় শব্দটি নিয়ে লজ্জিত হয়েছিলাম তা আমার মনে নেই। এমনকি কৈশোরে অনিরাপত্তাজনিত দুর্বলতাজনিত কয়েকটি মুহূর্ত বাদ দিলে কবে, কখন এ শব্দটি নিয়ে লজ্জা পেতাম তাও জানি না। আর তাই আমি উইমেন’স স্টাডিজ নামে একটি ঐচ্ছিক কোর্স নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি ভাবলাম, এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আমি আরও অনেক কিছু শিখতে পারব যেসব মূল্যবোধ আমি এতদিন ধরে শিখে এসেছি।
কিন্তু না তা হল না।

পুরো ক্লাসের বিষয়বস্তু আমার এখন আর মনে নেই। সেখানে অবশ্যই এমন কিছু মুহূর্ত ছিল যা খুব আনন্দদায়ক এবং আমাদের সবার জন্য উপযোগী। কিন্তু আমার যতটুকু মনে আছে খাতায় ‘আমেরিকান গার্ল ডলস’- এর বিরুদ্ধে না লিখে তাদের পক্ষে লেখার কারণে বাজে গ্রেড মিলেছিল। এছাড়া আমাদের প্রথম ক্লাসের বেশিরভাগ সময়জুড়ে মেকআপ, হাই হিল, ম্যানিকিউরকে ফাঁদ হিসেবে উল্লেখ করেন শিক্ষকরা।


কার্যত আমি এসব ননসেন্স জিনিসপত্রের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না

সৌন্দর্য শিল্পে অনেক ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে, যা অবশ্যই আমি অস্বীকার করতে পারি না: আমরা সবাই মানতে বাধ্য হই যে, নির্দিষ্ট কিছু বিষয় সৌন্দর্যের পরিমাপক, অন্যগুলো নয়। এ পরিমাপকগুলো মানসিক এবং শারীরিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। সৌন্দর্য শিল্প যে ধরনের চাপ তৈরি করে তাতে অধিকাংশ নারী তা প্রতিহত করার জন্য নিজেদের যথেষ্ট শক্তিশালী মনে করেন না। আমরা সকলে্ই ভুগি যখন ৬ আকারের একজন মডেলকে প্লাস সাইজ বলা হয়, আর বগলের নিচে চুল থেকে যাওয়ার কারণে কোন মেয়েকে নিয়ে হাসাহাসি করা হয়। কিন্তু আমি মনে করি নারী-পুরুষকে সৌন্দর্য আসলে কী তা নিয়ে শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে তাদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন এনে বেশ কিছু প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন আনা সম্ভব।

কিন্তু একজন শক্তিশালী নারীবাদী মানে এ নয় যে, নারীকে এমনটা বলা যে সে যা করছে তা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ফাঁদ- তাহলে সে কথাটি কোন কাজে লাগবে না। একজন নারীবাদী হওয়ার মানে হল সব নারীকে এবং তাদের পছন্দ ও রুচিকে সম্মান জানানো। হতে পারে সে যা পছন্দ করে তা আপনার পছন্দ নাও হতে পারে। তার মানে হল যে নারী বাড়িতে মা হিসেবেই থাকতে পছন্দ করেন তাকে অবমুল্যায়ন না করা, আবার যে নারী সন্তান ধারণ করতে চান না তার নারীত্বকেও অপমান না করা।

আমি যতটা সম্ভব নিজে নখের পরিচর্যা অর্থাৎ ম্যানিকিউর করাতে পছন্দ করি। এমনকি বর্তমানে আমি ভিটামিন সেবন করছি যেন আমার নখগুলো জেল ম্যানিকিউর করার মত মজবুত হয়। আমার চুলগুলো কেমন দেখাচ্ছে তা নিয়ে আমি বেশ উদ্বেগে থাকি।এটা আমার শতভাগ মানসিক দুর্বলতা। আমার কাছে খুবই চমৎকার হিল জুতো আছে যা আমি একবারই পরেছিলাম, আর পরা হয়নি। আমি সারা বছর বিভিন্ন পোশাক পরি, কিন্তু আমার কোন প্যান্টস্যুট কিংবা ব্লেজার নেই (আমি মানছি সেটা আমার থাকা দরকার ছিল)। গ্রুমিংয়ের জন্য আমার নিজস্ব একটা বরাদ্দ আছে। আমার আছে ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেট ক্রেডিট কার্ড।

আমি কী চরম লজ্জাহীন নারী
এতক্ষণ যা বললাম সেগুলোর কোন কিছু কি আমার কাছ থেকে একজন স্বাধীন, আত্মবিশ্বাসী নারী যে অনেক কাজ করে, প্রচণ্ড ভালোবাসে, এবং নিজেকে নারীবাদী বলতে অহংবোধ করে সেরকম পরিচয় ছিনিয়ে নিয়েছে? অবশ্যই না। আর এখন আমি একজন নারী হিসেবে, নারীবাদী হিসেবে, পরামর্শক হিসেবে, একজন মিত্র হিসেবে, ব্যবস্থা গ্রহণকারী হিসেবে আমার শক্তির পক্ষে সুর চড়া করতে যাচ্ছি। যদিও প্রতিদিন আমি যেসব নারীকে দেখতে পাই, তাদের অনেকের মতনই আমি অতটা চিত্তাকর্ষক নই।

কিন্তু এরপরও স্বাগত। নারীবাদী হওয়ার জন্য নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা কিন্তু নিজের নারীসুলভ আচরণকে অন্য তথাকথিত শক্তিশালী চেতনাবোধের সঙ্গে তুলনা করার প্রয়োজন নেই আমার। কারণ এগুলো আমার পছন্দ-নারীর মত থাকা, যখন কোন ছেলে আমাকে দরজা খুলে দেয় তা পছন্দ করা, প্রেম ছাড়া ‍বিয়ের ব্যাপারে অতিরিক্ত ভাবা এগুলো কোন কিছুই আপনাদের ভাবনা তৈরি করার বিষয় নয়। কারণ আমার কাছে যা মূল্যবান, আমার কাছে যা সম্মানজনক, যেগুলোর জন্য আমি বেঁচে আছি, নারী হিসেবে প্রতিদিন যে যুদ্ধ করছি তা অন্যের কাজে লাগবে এমন কোন কথা নেই।

সুতরাং নারীরা, আসুন এধরনের মূর্খতা বন্ধ করি। ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া না করি, একই সিদ্ধান্ত আপনার পছন্দ না হলেও। আর আসুন স্রোতে গা ভাসিয়ে দিতে চাই না-এমন ধরনের শব্দ বা বাক্য ব্যবহার বন্ধ করি। ইচ্ছে হলে আমরা ম্যানিকিউর করি, দামি হিল পরি। যখন সন্তান থাকবে তখন যা করতে চাই তা করি আবার সন্তান না থাকলেও একই কাজ করি। যখন যা চাই সব করি।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top