‘আমার ফ্যান কম, হেটার বেশি!’

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রায় সাড়ে আট বছর পেরিয়ে গেছে তামিম ইকবালের। এ সময়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেশসেরা ওপেনার হিসেবে, টেস্ট-ওয়ানডেতে হয়েছেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের মালিক। দলকে এনে দিয়েছেন বহু স্মরণীয় মুহূর্ত। বিশ্বকাপের পর গত ৯টি ওয়ানডেতে ৬৫.১৪ গড়ে করেছেন ৪৫৬ রান। ৫ টেস্টে ৫৩.৫৭ গড়ে রান ৩৭৫। তবুও ব্যাট কথা না বললেই চারদিক থেকে ধেয়ে আসে নানা সমালোচনা। তামিমের ক্রিকেট ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা কথা উঠে এসেছে এই আলাপচারিতায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রানা আব্বাস

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাড়ে আট বছর কেটে গেছে। ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন বলবেন কোনটিকে?

বললে অনেক কিছুই আছে, না বললে নেই। যদি বলতেই হয়, পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনা টেস্টে করা ডাবল সেঞ্চুরি। তবে ডাবল সেঞ্চুরির চেয়ে ইমরুল কায়েসের সঙ্গে ওই জুটিটা (৩১২ রানের) বড় অর্জন বলব।

বাংলাদেশের পক্ষে টেস্ট, ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রানের মালিক আপনি। বর্তমান দলের সদস্যদের মধ্যে কে আপনার ওয়ানডে-টেস্টে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড ভেঙে দিতে পারেন বলে মনে করেন?
তরুণ খেলোয়াড় যারা শুরু করেছে যেমন-সৌম্য সরকার, সাব্বির রহমান। যদিও সাব্বির একটু নিচে ব্যাট করে। যদি ওপরে ব্যাট করে, সম্ভব হতে পারে। আছে মুমিনুল হক। ও অবশ্য ওয়ানডেতে নিয়মিত খেলছে না। কয়েক বছর নিয়মিত খেললে ওর পক্ষেও সম্ভব। মুমিনুলকেই আমার সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় মনে হয়।

কেবল ওয়ানডে-টেস্টে সর্বোচ্চ রানই নয়, ক্রিকেটের তিন সংস্করণেই ইনিংসে সর্বোচ্চ রানের মালিক—এমন বহু অর্জন রয়েছে আপনার। তবুও একটু খারাপ খেললেই আপনাকে নিয়ে কেন এত সমালোচনা?
আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়, দুই ম্যাচ পরই পেছনের সবকিছু ভুলে যায় মানুষ। আমাকে বাদ দিতে উঠে-পড়ে লাগে! জানি না কেন এটা হয়। মনে হয়, আমার ফ্যান কম, হেটার বেশি! নইলে দুই ম্যাচ পরপর কেন বাদ দিতে ব্যস্ত হবে সবাই!

নাকি আপনার প্রতি সবার প্রত্যাশাটা বেশি…
হতে পারে। প্রত্যাশা বেশি থাকতে পারে। তবে সেটা তো নিজেই তৈরি করেছি। অন্য কেউ করে দেয়নি। তবে দুই ম্যাচ পর পর আমাকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়, এর রহস্যটা কী, সেটা আমি নিজেও জানি না। ভীষণ অবাক লাগে। বিষয়টি এমন দাঁড়িয়েছে, সবার জন্য যেখানে দশ ম্যাচ, আমার জন্য দুটো!

এ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেকে শান্ত রাখেন বা বোঝান কীভাবে?
একটা সময় খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিল আমার জন্য। খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। বিশেষ করে বিশ্বকাপের সময়। বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তাম মাঝেমধ্যে। এরপর বিশ্বকাপের পর নিয়মিত রান করেছি। পরিসংখ্যানের দিকে যদি তাকান, ওয়ানডের আট বছর ক্যারিয়ারে এ বছরটাই আমার সবচেয়ে ভালো গেছে। এরপরও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুটো ওয়ানডে খারাপ খেলার পর আমাকে বাদ দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল অনেকে। আসলে এটি নিয়ে ভেবে লাভ নেই। যতদিন খেলব, এসব সমালোচনা নিয়েই খেলতে হবে। এ নিয়ে এখন আর মাথা ঘামাই না।

আপনার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, কাছের মানুষদের কাছে আপনি খুব মজার মানুষ, আড্ডা জমাতে পারেন ভীষণ। বাইরে থেকে মানুষ ঠিক সেটা বুঝতে পারে না…
আসলে মানুষ আমাকে উদ্ধত ভাবে। তাদের কীভাবে বোঝাই, আমি উদ্ধত নই। খুব সাধারণভাবে চিন্তা করুন, রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। কাউকে চেনেন না। তখন অপরিচিত কারও সঙ্গে কি মন খুলে কথা বলতে পারবেন? কিংবা তার সঙ্গে মজা-ঠাট্টা করবেন? করবেন না। বন্ধু-বান্ধব, পরিবারের মানুষেরা আপনার চেনা। তাদের সঙ্গেই হাসি-ঠাট্টা, মজা করবেন। ঘুরবেন-ফিরবেন, তাই না? যাকে চিনি না, তার সঙ্গে কীভাবে মন খুলে কথা বলব? যাকে চিনি, তার সঙ্গে কথা তো বলি। অনেক মজা-ঠাট্টা করি। মানুষ যদি আমাকে উদ্ধত বানিয়ে দেয়, সেটা তাদের ব্যাপার। একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সবাই যে আচরণ করে, আমিও তা-ই।

খেলোয়াড়ি জীবনের আপনার সবচেয়ে সুখের অধ্যায় কোনটি?
ইমরুলের (কায়েস) সঙ্গে ৩০০ রানের জুটিটা (পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনা টেস্টে) সবচেয়ে বড় অর্জন। সামনে হয়তো নতুন কিছু আসতেও পারে। পেছনে ছোট ছোট অনেক কিছুই আছে। বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করাটা খুবই আনন্দের মুহূর্ত। তবে এখনো অনেক কিছু বাকি রয়েছে। বড় কোনো দলকে যখন টেস্টে হারাতে পারব, নিশ্চয় সুখের অনুভূতির সঙ্গে আরও কিছু যোগ হবে। কাজেই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা একটু কঠিন।

আর সবচেয়ে খারাপ লাগার অধ্যায়?
২০১৫ বিশ্বকাপ। এটা অবশ্য ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের কারণেই।

২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ডাউন দ্য উইকেটে গিয়ে ছক্কার স্মৃতি আজও নিশ্চয় দোলা দেয় মনে?
শটটা খেলতে ভালো লাগে বলেই খেলেছিলাম। কিন্তু সেটার রেশ যে আজও থাকবে, বুঝিনি (হাসি)!

খারাপ সময়ে সাংবাদিকদের নানা অপ্রিয় প্রশ্ন শুনতে হয়। যদি নিজে সাংবাদিক হতেন, তখন তামিম ইকবালকে কী প্রশ্ন করতেন?
যদি ক্রিকেট না বুঝতাম, তবে উল্টো-পাল্টা প্রশ্ন করতাম (হাসি)! আসলে প্রথমে ভাবতাম, যাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে দিন শেষে সে-ও মানুষ। এমন কোনো প্রশ্ন বা কাজ করতাম না, যেটা ব্যক্তিগতভাবে তাকে আঘাত করে। খারাপ খেললে পেশাদারির জায়গা থেকে অবশ্যই খেলাটার সমালোচনা করতাম। ভালো খেললেও সেভাবেই প্রশ্ন করা হতো। তবে এমন কিছু করতাম না, যাতে সে মানসিকভাবে আঘাত পায়।

টেস্টে সহ-অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনা টেস্টে মুশফিকুর রহিমের চোটের কারণে কিছু সময় মাঠও সামলেছেন। ভবিষ্যতে অধিনায়কত্ব করার মতো মানসিক প্রস্তুতি আছে কি না?
আসলে অধিনায়কত্ব নিয়ে খুবই কম ভাবি। টেস্টের জন্য যে সেরা, সে-ই এখন বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব করছে। আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছি না। এখনো অনেক কিছু শেখার আছে, শিখছি।

ক্রিকেট থেকে সবচেয়ে বড় পাওয়া
আব্বার (প্রয়াত ইকবাল খান) স্বপ্ন পূরণ করা। আব্বার স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলে খেলব। খেলতে পারছি। এখনো পর্যন্ত এটাই আমার জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া।

আকরাম খান, নাফিস ইকবাল, তামিম ইকবালের পর খান পরিবার থেকে চতুর্থ টেস্ট ক্রিকেটার উঠে আসার সম্ভাবনা আছে কি না? শুনেছি ভাতিজা নামির ইকবালের (নাফিস ইকবালের ছেলে) নাকি ভীষণ ঝোঁক ক্রিকেটের প্রতি। ওকে নিয়ে কী স্বপ্ন দেখছেন?
আমাদের স্বপ্নের চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, সে কী ভাবছে? জোর করে কিছু চাপিয়ে দিতে চাই না। ক্রিকেটারের জীবনটা সহজ নয়। বাইরে থেকে মনে হতে পারে, সবকিছু পাচ্ছি, মজা করছি। ৫০ ওভার খেলেই অনেক কিছু হয়ে যাচ্ছে। ধরুন, ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে দুই কোটি মানুষ ক্রিকেট খেলে। এর মধ্যে মাত্র ১৫ জন সুযোগ পায় জাতীয় দলে। ওই ভাগ্যবানদের দলে নামির থাকবে কি না, বলা কঠিন। তার যদি প্রতিভা থাকে, ইচ্ছে থাকে এবং কঠোর পরিশ্রম করে, তবে হবে। ক্রিকেটার হলেও খুশি হব, অন্য পেশাতে গেলেও খুশি।

জুনিয়র তামিমকে কবে দেখতে পাবে ভক্ত-সমর্থকেরা?
যেদিন আসবে, সেদিন দেখতে পাবেন (হাসি)।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top