কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাবে যে ৭ ধরনের খাবার

কোলেস্টেরলের হচ্ছে রক্তের মাঝে প্রাপ্ত এক ধরনের ফ্যাট। মস্তিস্ক, ত্বক, এবং অন্যান্য অঙ্গের বৃদ্ধি এবং সঠিক ভাবে কাজ করার জন্য দেহে কোলেস্টেরলের প্রয়োজন হয়। যকৃত সাধারণত দেহে কোলেস্টেরল তৈরি করে। এছাড়া বিভিন্ন খাবার থেকে বিশেষ করে প্রাণীজ উৎস যেমন মাংস, ডিম, বাটার, পনির এবং দুধ থেকে দেহে কোলেস্টেরল পাওয়া যায়। তবে এই উপাদানটি প্রয়োজনের তুলনায় দেহে যদি বেশি হয়ে যায় তখন তা নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। তাই অনেক সময় কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে ঔষধ খাওয়ারও প্রয়োজন হয়। কিন্তু কিছু খাবার আছে যেগুলো হৃদ স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী এবং তা প্রাকৃতিক ভাবেই কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। এখানে কিছু পরীক্ষিত খাবারের কথা উল্লেখ করা হল যা কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

জলপাই তেল ও জলপাইয়ের তৈরি খাবার

জলপাই তেল উচ্চমাত্রার মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড ও ভিটামিন ই সমৃদ্ধ। গবেষনায় দেখা যায় যে যেসব খাবারে মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড থাকে সেসব খাবার খারাপ কোলেস্টেরল LDL এর মাত্রা কমায় এবং ভালো কোলেস্টেরল HDL এর মাত্রা বাড়ায়। যাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি তাদের ভালো কোলেস্টেরল HDL মাত্রা বাড়াতে এবং খারাপ কোলেস্টেরল LDL এর মাত্রা কমাতে জলপাই তেল ও জলপাইয়ের তৈরি খাবার গ্রহন করা উচিত। প্রতিদিন রান্নায় বা সালাদের সাথে ১-২ টেবিল চামচ জলপাই তেল বা সালাদে কিছু জলপাই দিয়ে খাওয়া খুবই উপকারী। এছাড়া জলপাই তেল থেকে প্রস্তুতকৃত মার্জারিন যদি খাওয়া যায় তাহলে তা থেকে মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিডের উপকারীতা পাওয়া যায়।

শিম বা ডাল বীজ জাতীয় খাবার

এই জাতীয় খাবারগুলো হচ্ছে শিম, মসুর ডাল, মটরশুঁটি, সয়াবিন এবং সয়া দিয়ে তৈরি সব ধরনের খাবার যেমন রান্না করা সয়াবিন, সয়া কুচি, টুকরো, সয়া দুধ, টফু ইত্যাদি। এসব বীজগুলোতে থাকে অনেক বেশি পরিমানে খাদ্যআঁশ এবং খনিজ পদার্থ, ভিটামিন বি ও ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট সহ দেহের প্রতিরক্ষা মূলক কাজে সাহায্যকারী পুষ্টি উপাদান। এসব পুষ্টি উপাদানগুলো হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী আর খাদ্য আঁশ দেহে শক্তি সরবরাহ করে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। এসব বীজ সাধারণত প্রাকৃতিকভাবেই কোলেস্টেরল বিহীন এবং কম ফ্যাটযুক্ত। এছাড়া এগুলো লো গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স (GI) খাবার. তাই শিম, মটরশুঁটি, সয়াবিন এবং মসুর ডাল জাতীয় এই খাবার গুলো আমাদের খাবার তালিকায় সপ্তাহে ৩/৪ দিন রাখা উচিত আর যদি প্রতিদিন খাওয়া সম্ভব হয় তাহলে খুবই ভালো।

ফ্যাট ছাড়া দুধ, দই ও দুগ্ধ জাতীয় খাবার

ফুল ক্রিম দুগ্ধ জাতীয় খাবার এবং বেশির ভাগ পনিরে থাকে অনেক বেশি পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট তাই যদি কারো কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকে তাহলে এসব খাবার অবশ্যই বর্জন করতে হবে। তবে তার মানে এই নয় যে দুগ্ধ জাতীয় সব খাবারই বর্জন করতে হবে। কারন দুগ্ধ জাতীয় খাবার খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিলে হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় এবং দেহের অন্যান্য কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ ক্যালসিয়ামের অভাব হবে। তাই এসব ক্ষেত্রে ফ্যাট ছাড়া দুধ, দই, কটেজ পনির ইত্যাদি হচ্ছে লো কোলেস্টেরল ডায়েট। দুগ্ধ জাতীয় খাবারগুলো থেকে যখন ফ্যাট সরিয়ে নেয়া হয় তখন তা থেকে কোলেস্টেরলও সরে যায়। সবচেয়ে ভালো হচ্ছে ফ্যাট ছাড়া দই যার মাঝে থাকে উচ্চ মাত্রার প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং Lactobacillus নামক microorganisms যা কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফল ও সবজি

সব ধরনের ফল ও সবজিই সাধারণত কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে এবং হৃদপিণ্ডকে ভাল রাখতে সহায়তা করে। তবে বিশেষ দুই ধরনের ফল ও সবজি বেশি উপকারি। যেসব ফল ও সবজিতে বেশি পরিমানে ভিটামিন সি ও বিটা ক্যারোটিন থাকে।

১) ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল ও সবজি: সব ধরনের টক ফলসহ যেসব খাবারে ভিটামিন সি বেশি থাকে যেমন কমলা, জাম্বুরা, পেয়ারা, আমলকী ইত্যাদি। সব ধরনের বেরি ফল যেমন ক্র্যানবেরি, স্ট্রবেরি, ব্ল্যাক বেরি ইত্যাদি। এছাড়া আম, সব ধরনের কপি (সবুজ বাঁধাকপি, চাইনিজ বাঁধাকপি, ব্রকলি, ছোট বাঁধাকপি) এবং কাঁচা মরিচ।

২) বিটা ক্যারোটিন: উচ্চ মাত্রার বিটা ক্যারোটিন সমৃদ্ধ খাবারগুলো হচ্ছে সব ধরনের হলুদ ফল (অ্যাপ্রিকট, হলুদ পিচ ফল, আম) এবং সবজি (মিষ্টি কুমড়া, মিষ্টি আলু, গাজর ইত্যাদি)। এছাড়া গাঢ় সবুজ শাকসবজি (পালং শাক থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সবুজ শাক, বাঁধাকপি, ব্রকলি ইত্যাদি)।
তাই যাদের হৃদরোগ আছে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি যাদের প্রতিদিনের খাবারে অবশ্যই এসব ফল ও সবজি বেশি পরিমানে থাকা উচিত।

রসুন ও পেঁয়াজ জাতীয় খাবার

ভালো স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য রসুন কয়েক শতাব্দী ধরেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবেষণায় দেখে যায় যে allium পরিবারের অর্থাৎ রসুন, পাতা, পেঁয়াজ এই ধরনের খাবার গুলো হৃদরোগ প্রতিরোধে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। তাই রসুন এবং পেঁয়াজ রান্নায় এবং তাজা সালাদে দিয়ে খাওয়া ভালো। গবেষকরা মনে করেন যে বেশি রসুন ব্যবহার করে রান্না করা ভূমধ্য সাগরীয় খাবারগুলো সত্যিকার ভাবেই হৃদরোগ বান্ধব খাবার।

ভুষিসহ অপ্রক্রিয়াজাতকৃত শস্য খাদ্য

সব ধরনের অপ্রক্রিয়াজাত ভুষিসহ শস্য খাদ্য এবং সিরিয়াল, লাল আটার তৈরি খাবার উচ্চ মাত্রার বি ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং দ্রবণীয় ও অদ্রবণীয় উভয় ধরনের খাদ্য আঁশ সমৃদ্ধ। সেই সাথে এই খাবার গুলো কম ফ্যাট এবং কম কোলেস্টেরলযুক্ত। অপ্রক্রিয়াজাত ময়দা দ্বারা তৈরি বিভিন্ন সিরিয়াল (লাল আটার পাউরুটি, ক্র্যাকার্স, সিরিয়াল) ইত্যাদিতে বেশি পরিমান খাদ্য আঁশ থাকে। এছাড়া যব এবং যবের ভুষি যা আমাদের কাছে ওটস নামে পরিচিত সেগুলোতে উচ্চ মাত্রার দ্রবণীয় আঁশ থাকে বলে এগুলো কার্যকর ভাবে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। প্রতিদিনের খাবারে এক বাটি ওটস রাখলে তা কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

মাছ

গবেষকরা আবিষ্কার করেছেন যারা প্রতি সপ্তাহে ৩-৪ দিন বা এর বেশি পরিমানে মাছ খান তারা হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপে কম ভোগেন। এর প্রাথমিক কারণ হলো মাছে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড। যদিও অমেগা-৩ ফ্যাটি এসিডের সবচেয়ে ভালো উৎস হচ্ছে স্যামন, টুনা সহ সামুদ্রিক মাছ তবে হৃদপিণ্ডকে ভাল রাখতে যে কোনো ধরনের মাছই উপকারি। নিয়মিত মাছ খেলে এতে থাকা অমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড atherosclerosis এর ঝুঁকি কমায়,, ventricular arrhythmias প্রতিরোধ করে, রক্তের চর্বি কমায়, atherosclerotic plaque এবং উচ্চ রক্তচাপ কমায়। এছাড়া এটা কোলেস্টেরলের মাত্রাও কমায়।

লেখক
শওকত আরা সাঈদা(লোপা)
জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিদ
এক্স ডায়েটিশিয়ান,পারসোনা হেল্‌থ
খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান(স্নাতকোত্তর)(এমপিএইচ)
মেলাক্কা সিটি, মালয়েশিয়া।

 

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top