যেসব কারণে ওজন কমাতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন আপনি

দেহের ওজন একদিনে বৃদ্ধি পায় না। অনেক সময় নিয়েই বৃদ্ধি পায়। বেশির ভাগ মানুষই সময় থাকতে সচেতন হন না। তারপর শুরু হয় ওজন কমানোর যুদ্ধ। আর তখন ওজন কমাতে গিয়ে শুরু হয় তাড়াহুড়ো। সবাই চান অল্প সময়ে অল্প পরিশ্রমে দ্রুত ওজন কমিয়ে ফেলতে। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে ওজন দ্রুত কমাতে চাইলে হয়তো অনেক ভাবেই কমানো সম্ভব কিন্তু কষ্টকর হয় সেটা ধরে রাখা। দ্রুত কমানো ওজন সেভাবেই আবার দ্রুত বেড়ে যায়।

 

ওজন কমাতে অনেকেই অনেক ভাবে চেষ্টা করে থাকেন কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সেগুলো বেশির ভাগ সময়ই কাজে লাগে না। অনেকেই হয়তো শারীরিক ব্যায়াম করছেন, ক্যালরির দিকে এবং কী খাবার খাচ্ছেন সেদিকেও খেয়াল রাখছেন। ওজন কমানোর জন্য অনেক ধরণের নিয়মও মেনে চলছেন কিন্তু কাজ হচ্ছে না। ওজন কিছুতেই কমছে না। তাহলে আপনাকে বুঝতে হবে কোথাও কোনো সমস্যা অবশ্যই আছে। সমস্যাটা হয়তো এমন কোথাও যেটাকে আপনি হয়তো এত গুরুত্বপূর্ণ মনেই করছেন না। যে সমস্যা গুলোর কারনে আপনার ওজন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা পূর্ণ হচ্ছে না এখানে সেই কারণগুলো তুলে ধরা হলো-

দ্রুত ডায়েট পরিবর্তন করা

আপনি হয়তো এক ধরনের ডায়েট অনুসরণ করছেন হঠাৎ অন্য কারো কাছে নতুন কোনো ডায়েটের কথা শুনে আবার সেটা শুরু করে দিলেন। হয়তো দেখা যাচ্ছে প্রায় একই ধরণের ডায়েট ১/২ সপ্তাহ আগেও আপনি অনুসরণ করেছেন। এভাবে যদি আপনার খাবার ব্যবস্থাপনা দ্রুত পরিবর্তন করতে থাকেন তাহলে ওজন কমবে না বরং আপনি নিজের হৃদরোগ সংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি বাড়াবেন। তাই কে কী বললো সেদিকে নজর না দিয়ে অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে সঠিক একটি খাবার ব্যবস্থাপনা ও জীবন যাপনের ধারা অনুসরণ করুন।

দেহের বিষাক্ত পদার্থ

ভেজাল ছাড়া এখন আর কোনো কিছুই নেই। খাবার থেকে শুরু করে পরিবেশ দূষণ কোনো কিছুই বাদ নেই। এসব বিষাক্ততা দেহের হরমোনের ক্ষতি করে এবং দেহের তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। এর ফলে দেহে ফ্যাট আটকে যায়। তখন আর সহজে ওজন কমতে চায় না। তাই কার্যকরী ভাবে ওজন কমাতে গেলে প্রথম পদক্ষেপই হচ্ছে দেহের বিষাক্ততা দূর করা। তবে এটা ঠিক যে দেহের বিষাক্ততা কোনো উপায়ে একবারে দূর করা সম্ভব না। বিষাক্ততা দূরীকরণের বিভিন্ন পানীয়গুলো খেতে পারেন এবং সেই সাথে স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে। বেশি করে উচ্চ প্রোটিন এবং খাদ্য আঁশ সমৃদ্ধ সবুজ শাকসবজি খেতে হবে বিষাক্ততা দূর করার চেষ্টা থাকতে হবে প্রতিদিনই এবং চেষ্টা করতে হবে দূষণ থেকে দূরে থাকতে।

খাবার বাদ দেয়া

অনেকেই ভেবে থাকেন যদি একটু দেরি করে খেয়ে বা যেকোনো এক বেলার খাবার বাদ দিয়ে হয়তো খুব দ্রুত ওজন কমানো সম্ভব। আবার অনেকের মাঝেই এমন প্রবণতা রয়েছে যে ওজন কমাতে রাতে খান না। সাধারণত রাতে আগে খেয়ে ফেলতে হবে। রাতে না খেলে সারা রাতের অনেকটা সময় পেট খালি থাকে এবং সকালে যখন খাওয়া হয় তখন বেশি ক্ষুধা থাকার ফলে বেশি খাবার গ্রহণ করা হয়ে যায়।

ভিটামিন ডি এর অভাব

দেহের জন্য অত্যাবশ্যক একটি উপাদান হচ্ছে ভিটামিন ডি। বিশেষ করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের কার্যাবলীর জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। তাই যদি দেহে এই ভিটামিনটির অভাব থাকে তাহলে ফ্যাট বার্ন হয়না। তাই দেহে ভিটামিন ডি এর অভাব আছে কিনা পরীক্ষা করে বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নিন। যদি থাকে তাহলে খাবারে যোগ করুন ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার। তৈলাক্ত মাছ, মাশরুম, কলিজা, গরুর দুধ, ডিমের কুসুম, বাদাম ইত্যাদি হচ্ছে ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার।

প্রয়োজনীয় ফ্যাট গ্রহণ না করা

স্বাভাবিক ভাবেই ধরে নেয়া হয় যে ফ্যাট বার্ন করার জন্যই ফ্যাট জাতীয় খাবার বর্জন করা উচিত কিন্তু বাস্তবিকভাবে দেহের ফ্যাট বার্ন করার জন্য কিছু ফ্যাটের প্রয়োজন আছে তবে অবশ্যই সেটা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট হতে হবে। স্বাস্থ্যকর ফ্যাটি খাবারগুলো হতে পারে অলিভ অয়েল, নারকেল তেল, টকদই, ঘাস খাওয়া গরুর মাংস, অ্যাভোকাডো, কাঠবাদাম, ডার্ক চকলেট, স্যামন মাছ ইত্যাদি।

অতিরিক্ত ব্যায়াম

ওজন কমানোর জন্য শারীরিক ব্যায়াম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে সব কিছুরই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ থাকে। যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যায়াম করা হয় তখন অনেক সময় সঠিক ফল পাওয়া যায় না। শরীরকে বিরতি দিয়ে ব্যায়াম করা বেশ ফলপ্রদ। প্রতিদিন হাটুন এবং একই ব্যায়াম প্রতিদিন না করে সপ্তাহে ৩-৪ দিন করুন। সেই ব্যায়ামগুলোর উপর জোর দিন যে ব্যায়ামগুলো করলে শারীরিক ও মানসিক ভাবে ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিন।

মানসিক চাপে থাকলে

আমাদের জীবনে মানসিক চাপ যদিও সাধারণ একটি ব্যাপার। কিন্তু যদি অত্যাধিক মানসিক চাপের মাঝে থাকা হয় তাহলে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায় এবং সেরোটোনিন হরমোনের মাত্রা কমে যায়। যার ফলে মিষ্টি জাতীয় খাবারের ইচ্ছেটা বেড়ে যায়। এছাড়া কর্টিসল হরমোন পাকস্থলীতে প্রয়োজনীয় এসিডের পরিমান কমিয়ে দেয় ফলে খাবার হজম হতে সমস্যার সৃষ্টি হয়। এজন্য ক্ষুধা বেড়ে যায়, খাবার বেশি খাওয়া হয়।

বেশি চিনি খেলে

স্বাস্থ্য সচেতন সবাই হয়তো জানেন যে চিনি খেলে ওজন বাড়ে। মিষ্টি জাতীয় খাবারে চিনি থাকে তা আমরা সবাই জানি কিন্তু ঝাল বা অন্য খাবারেও অদৃশ্য চিনি থাকে যার উপস্থিতি বোঝা যায় না। আসলে প্রধান ৩ ধরনের শর্করার মাঝে চিনি এক প্রকার শর্করা। আমরা যে চিনি খাই বা রান্নায় ব্যবহার করি সেটার নাম হচ্ছে সুক্রোজ। ফলে যে চিনি থাকে তাকে বলে ফ্রুক্টোজ এবং দুধে যে চিনি থাকে তাকে বলা হয় ল্যাক্টোজ। তাই বিভিন্ন খাবারের অদৃশ্য চিনিগুলো আমাদের ওজন বৃদ্ধি কারন হয়ে থাকে।ফ্রুক্টোজ সরাসরি লিভারে গিয়ে ফ্যাট তৈরি করে। এছাড়া এটি চিনি খাবার ইচ্ছেকে বাড়িয়ে দেয় যা ওজনও বাড়ায়। তাই খাবার খাওয়ার আগে প্যাকেটের গায়ে লিখা উপাদানগুলো দেখে খাওয়ার চেষ্টা করুন।

থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে

বিপাক ক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে থাইরয়েড হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই যাদের থাইরয়েডের সমস্যা রয়েছে ওজন কমাতে চাইলে আগে সেটা পরীক্ষা করে জেনে নেয়া প্রয়োজন কোন অবস্থায় আছে তা বোঝার জন্য। সাধারণত থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন টেস্ট(TSH)করা হয়ে থাকে থাইরয়েডের সমস্যা জানার জন্য।

থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন টেস্টের(TSH)স্বাভাবিক মাত্রা

– প্রাপ্ত বয়স্কদের ০.৪-৪.২(mcU/ml)

– বাচ্চাদের ০.৭-৬.৪(mcU/ml)

– নবজাতকের ১-৩৯(mcU/ml)

এই স্বাভাবিক মাত্রার বেশি বা থাকলেই দেহের ওজন বৃদ্ধি পেতে পারে।

ব্যায়ামের পর বেশি খেয়ে ফেললে

অনেক সময় দেখা যায় ক্র্যাশ ডায়েট করে কিছুটা ওজন কমার পর বেশি খাওয়া শুরু করে অনেকে। আবার হয়তো শারীরিক ব্যায়াম করে ১০০-১৫০ ক্যালরি কমিয়ে ভাবেন যে যেকোনো খাবার যেকোনো পরিমাণে খাওয়া যাবে। আসলে ঠিক তা নয়। কারন অনেকেই জানেন না যে প্রতিদিন যদি ১০০ ক্যালরি বাড়তি খাওয়া হয় মাস শেষে সেটা প্রায় ১-২ কাজে ওজন বাড়িয়ে দিতে পারে। এভাবে খাওয়ার পরিবর্তে কম ক্যালর‍ি যুক্ত এমন কিছু খান যা থেকে শক্তি পাবেন বা পেশীর ক্ষয় রোধ করবে এবং পেটও ভরবে।

পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব

যদি সারাদিনে ৭ ঘন্টার কম ঘুমানো হয় তাহলে ওজন কমানোর লক্ষ্য অর্জনে সফল হবেন না। কারণ কম ঘুমের ফলে রক্তের শর্করার, ইনসুলিন এবং কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। এর ফলে মানসিক চাপ বাড়বে সেই সাথে বাড়বে ক্ষুধা। যদি পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব হয় তাহলে ইনসুলিন হরমোন প্রতিরোধ হতে পারে। যার ফলে অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

পর্যাপ্ত পানি পান না করা

দেহের ওজন কমানোর জন্য পানি প্রচুর সাহায্য করে। এটা ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করে। ক্ষুধা কমাতে পানি ছাড়াও বেশ কিছু সহায়ক পানীয় পান করতে পারেন। কিন্তু সমস্যা হয় তখনি যখন অন্যান্য নিয়ম পালন করলেও পর্যাপ্ত পানি পান না করলে। তখন ওজন কমানোর সঠিক লক্ষ্য অর্জিত হয় না। পানি পানের ফলে শরীর আর্দ্র থাকে। শরীর আর্দ্র থাকলে কিডনি সঠিক ভাবে কাজ করবে। যদি কিডনিতে সমস্যা হয় তাহলে লিভারে চাপ পরে। তখন লিভারের বেশি কাজ করতে হয়। এতে যে খাবারগুলো খাওয়া হয় সেগুলো ফ্যাট হিসেবেই জমা থেকে যায় বার্ন হয় না।

 

তাই উল্লখিত ভুলগুলোর এক বা একাধিক কারণ যদি থেকে থাকে তাহলে আপনার ওজন কমানোর লক্ষ্যকে অকার্যকর করে দিতে পারে। তাই ওজন কমাতে মনস্থির করলে চেষ্টা করুন এই ভুলগুলো এড়িয়ে যেতে বা থাকলে তা সংশোধন করে নিতে। তাহলেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেতে কষ্ট হবে না।

লেখিকা

শওকত আরা সাঈদা(লোপা)

জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিদ

এক্স ডায়েটিশিয়ান,পারসোনা হেল্‌থ

খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান(স্নাতকোত্তর)(এমপিএইচ)

মেলাক্কা সিটি, মালয়েশিয়া।

 

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top