সহজ তিনটি উপায়ে সুস্থ রাখুন হৃদপিণ্ড

যদি বলা হয়, সকল মানবীয় আবেগ এবং অনুভূতির সাথে আপনার হৃদপিণ্ডের সুস্থতা নির্ভর করছে, তবে আপনি কি বিশ্বাস করবেন? গবেষণা জানাচ্ছে যে, আমাদের আবেগ এবং অনুভূতিগুলো সরাসরিই হৃদপিণ্ড এবং হৃদপিণ্ডের কার্যকারিতা সাথের সংযুক্ত। শুধু তাই নয়, ইতিবাচক আবেগ আপনার হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে থাকে অনেকখানি।

ইতিবাচক এবং নেতিবাচক আবেগ এর উপর বহুলাংশে নির্ভর করছে আপনার হৃদপিন্ডের সুস্থতা। জেনে নিন তিনটি খুবই সাধারণ কিন্তু গবেষণালব্ধ উপায় যা আপনার হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে ও তার কার্যকারিতাকে ঠিক রাখতে সাহায্য করবে।

১/ নিজের মাঝে সবসময় ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখতে হবে

ইতিবাচক মনোভাব শুধুমাত্র যে কারোর মানসিক প্রশান্তি এবং আনন্দের উৎস তাই কিন্তু নয়, ইতিবাচক আবেগ এবং অনুভূতি হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা ভালো রাখতে এবং হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখতেও সাহায্য করে থাকে। যে কারণে, সে কোন সময়ে, যে কোন পরিস্থিতিতে সবসময় ইতিবাচক মনোভাব রাখাটা নিজের সুস্থ স্বাস্থ্যের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়।

যে কোন কঠিন পরিস্থিতি, খারাপ সময়ের মাঝেও নিজেকে ভালো রাখার, নিজে খুশি থাকার এবং নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে। ইতিবাচক মনোভাব যে কারোরই মানসিক স্বাস্থ্য এবং শারীরিক স্বাস্থ্য উভয়কেই সুস্থ রাখতে সাহায্য করে থাকে।

অন্যদিকে, নেতিবাচক আবেগ এবং অনুভূতি যেমন- মনঃকষ্ট, দুশ্চিন্তা, রাগ, হতাশা ইত্যাদি হৃদপিণ্ডের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যহত করে থাকে। এইসকল নেতিবাচক অনুভূতি হৃদপিণ্ড থেকে রক্ত এবং অক্সিজেন পাম্প করে পুরো শরীরে প্রবাহ করার প্রক্রিয়াকে বাধা প্রদান করে থাকে। যার ফলে, যিনি মনঃকষ্টে রয়েছেন তার মাঝে কাজ করার, ব্যায়াম করার, খাওয়া-দাওয়া করার প্রতি প্রবল অনীহা দেখে দিতে শুরু করে, যেটা হৃদস্বাস্থ্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক লম্বা সময় ধরে কারোর মাঝে হতাশা এবং দুঃখবোধ কাজ করলে তার হৃদপিণ্ডের উপরে বাড়তি চাপ পড়ে। যার ফলে হৃদপিণ্ডের বিভিন্ন ধরণের রোগের ঝুঁকি অনেক বেশী পরিমাণে বেড়ে যায়! (Carney  Freedland, 2017)

তবে এটা সত্য, অনেক সময়, অনেক পরিস্থিতিতে ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখাটা খুবই কষ্টকর এবং অনেক ক্ষেত্রে দুঃসাধ্যও হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে অবশ্যই কোন এক্সপার্টের সাহায্য নিতে হবে।

২/ পারিপার্শ্বিক চাপের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে

চারপাশ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে কারোর উপর ক্রমাগত মানসিক চাপ দেওয়াটা এখন যেন সমাজের একটি অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মানসিক চাপটা আসতে পারে যেকোন ক্ষেত্র থেকেই। নিজের বাসা থেকে শুরু করে, কর্মক্ষেত্র, সম্পর্ক, টাকা পয়সার সমস্যা, শারীরিক সমস্যা ইত্যাদি। প্রতিদিনের এমন হাজারো মানসিক চাপের মাঝে থেকেও এই সকল চাপগুলোকে এড়িয়ে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বুদ্ধি করে কীভাবে এইসকল চাপ কমিয়ে নিজের স্বাভাবিক জীবন যাপনের সাথে অভ্যাস্ত হওয়া যায় তার চেষ্টা রাখতে হবে নিজের মাঝে।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, প্রতিদিনের কাজের চাপ শেষে নিজের জন্য কিছু অবসর সময় বের করে নিতে পারেন। পছন্দের গান শুনতে অথবা বই পড়তে পারেন। কোন মনঃকষ্টের কথা, যা মানসিকভাবে চাপের মাঝে রাখছে, সে সকল কথা কোন কাছে বন্ধুর সাথে শেয়ার করতে পারেন।

এই সকল মানসিক চাপ কমানোর উপায়গুলো দুশ্চিন্তা কমিয়ে ইতিবাচক আবেগ বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। যার ফলে হৃদপিণ্ডের উপর পড়া বাড়তি চাপ কমে যায়। (Sgoifo et al, 2014) মানসিক এই প্রশান্তিটুকু উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদপিণ্ডের সমস্যার ঝুঁকি কমিয়ে দেয় অনেকখানি।

৩/ পরিবার এবং চারপাশের সকলের সাথে চমৎকার সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলুন

সাম্প্রতিক সময়ের এক গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, ১৯৮০ সালের তুলনায় এখনকার সময়ের মানুষেরা দ্বিগুণ পরিমাণে একাকীত্ব বোধ করেন, যা ২০% থেকে বর্তমানে ৪০% এ এসে দাঁড়িয়েছে! একজন মানুষ যখন একাকিত্বে থাকেন তখন তারা অনেক বেশী দুশ্চিন্তা, মনঃকষ্ট এবং মানসিক চাপের মাঝে থাকেন। যা শুধুমাত্র মানসিক ক্ষতি করে না, শারীরিক ক্ষতির কারণ হয়েও দাঁড়ায়।

অন্যদিকে, কেউ যখন অন্য কারোর সাথে যোগাযোগ করেন কিংবা কথা বলেন, তখন হরমোনের নিঃসরণের মাধ্যমে ব্রেইন হৃদপিণ্ডের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। যার ফলে হৃদপিণ্ডের কার্যক্রম খুব দারুণভাবে চলমান থাকে, যা শরীরের রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরলের মাত্রাকে ত্বরান্বিত করে বলে মানসিক চাপের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারাটা খুব সহজ হয়ে যায়। (Cacioppo et al, 2015).

এছাড়াও বিভিন্ন প্রাণীর উপরে করা বেশ কয়েকটি গবেষণা এবং স্টাডি থেকেও পাওয়া গিয়েছে দারুণ সকল তথ্য! Prairie voles (এক প্রজাতির ইঁদুর বিশেষ প্রাণী) এর উপরে করা গবেষণা থেকে দেখা গিয়েছে, যে সকল প্রেইরি ভোলস তাদের পরিবারের সাথে বেশী সময় কাটায় এবং যারা তাদের পরিবারের সাথে সময় কাটায় না, তাদের তুলনায় অনেক বেশি পারিপার্শ্বিক চাপ গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে। (McNeal et al, 2017).

এই গবেষণার ফলাফল থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার পরিষ্কার হয়। পরিবার এবং চারপাশের পরিচিত সকলের সাথে চমৎকার সামাজিক বন্ধন গড়ে তোলাটা, ব্রেইন এবং হৃদপিণ্ড এর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে দেয় যা হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

মানবিক আবেগ এবং অনুভূতির সাথে হৃদপিণ্ড এবং তার কার্যকলাপ কীভাবে সংযুক্ত- সেটা সঠিকভাবে জানার এবং বোঝার মাধ্যমে আমরা চাইলেই খুব সহজে মানসিক চাপ, রাগ, মনঃকষ্ট থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতে পারি। সুখী থাকা, আনান্দে থাকা এবং ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখার মাধ্যমে শুধুমাত্র মানসিকভাবেই নয় সুস্থ থাকা যাবে শারীরিকভাবেও।

সূত্র: Psychology Today.  

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top