ঔষধ যেভাবে আমাদের মেরে ফেলে

যে সুইপার ময়লাভর্তি ড্রেনে মাথা ডুবিয়ে ড্রেন পরিষ্কার করে, আপাত দৃষ্টিতে তার শরীরে ঘা-পঁচন হবার কথা। কিন্তু তারা বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকে। তুলনামূলকভাবে তাদের স্কিন ডিজিস যতটা হবার কথা ততটা হয় না।
ঐ পানিতে আমরা পা রাখলে?
হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে হত। ইনফেকশনে ছেয়ে যেত।
তাদের কী এমন ক্ষমতা আছে যা আমাদের নেই?

আমাদেরও আছে।
মায়ের জরায়ু থেকে যখন আমরা পৃথিবীতে ল্যান্ড করি তখন আমাদের শারিরীক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত দূর্বল। আমাদের মাত্র দুটো অস্ত্র হাতে। দুটো অ্যান্টিবডি। একটা পেয়েছি আম্বিলিক্যাল কর্ড দিয়ে। মায়ের রক্ত থেকে আমাদের রক্তে। নাভীর ভেতর দিয়ে আমাদের রক্তে ঢোকে (IgG)।
আরেকটা পাই মায়ের দুধ থেকে (IgA)।
এই দুটো মাত্র সম্বল নিয়ে আমরা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থেকে, বড় হতে শুরু করি।

আর কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা?
না।
আর কিছু নেই।
তাহলে আমরা কীভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকব?
এই সিস্টেমটা বড় অদ্ভুত।
ধরা যাক, আমার শরীরে একটা নতুন ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করল। আমার শরীর অসুস্থ হবে। জ্বর হবে। জ্বর অসুখ নয়। এটা একটা নিরাপত্তা সিস্টেম। আমাদের মস্তিষ্ক শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। যেন ব্যাকটেরিয়ারা অধিক তাপে ঠিকঠাক কাজ না করতে পারে, বাচ্চাকাচ্চা জন্ম না দিতে পারে। বাচ্চা দিতে না পারলে রোগই সৃষ্টি হবে না।

তাহলে জ্বর কী খারাপ?
না।
জ্বর হচ্ছে মানে আমাদের শরীরের নিরাপত্তা সিস্টেম ঠিকঠাক কাজ করছে, তার প্রমাণ।
জ্বর হলে আমরা কী করি?
একটু গা গরম হলেই ঔষুধ খেয়েই জ্বর বন্ধ করি। ব্যাকটেরিয়া ধুমসে বাচ্চাকাচ্চা জন্ম দেয়। আরো যদি অ্যান্টিবায়োটিক ঔষুধ ফুলডোজ না খাই, তাহলে আর কথা নাই। দেহ হয়ে যাবে ব্যাকটেরিয়ার গুদাম। একেকটা হবে সিরিয়াস লেভেলের শক্তিশালী জীবানু।

যদি ঔষুধ না খাই তাহলে কী হতে পারে?
প্রত্যেক সেকেন্ডে আমাদের শরীরে কোটিকোটি জীবানু প্রবেশ করে। আমরা কী প্রত্যেক সেকেন্ডে অসুস্থ হয়?
জীবানু ও শরীরের পারস্পারিক যুদ্ধে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের শরীর জিতে যায়। আমাদের রক্ত এই জিতে যাবার ব্যাপারটাকে ‘মেমরি/স্মৃতি’ বানিয়ে সেইভ করে দেয়। পরবর্তীতে একই জীবানু আসলে কোন কালক্ষেপণ নয়। সাথেসাথে এটাক করে ধ্বংস করে।
যেভাবে একবার পক্স হলে জীবনে আর পক্স হয় না (বিশেষ ক্ষেত্রে আবার হতে পারে)। কারণ পক্সের বিরুদ্ধে আমাদের শরীর একটা স্থায়ী মেমরি তৈরি করে রাখে। দ্বিতীয়বার প্রতিরোধ করার জন্য।

ব্যাপারটা কী দাঁড়াল?
হিউম্যান বডি ব্যাপারটায় স্পেশাল। তার নিজস্ব সিস্টেম আছে বেঁচে থাকার। অধিকাংশ সময় তার কোন সাপোর্ট লাগে না। ঔষুধ লাগে না, ডাক্তার লাগে না। সে নিজেই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ডাক্তার।
এই ডাক্তার আপনাকে বুঝতেই দিচ্ছে না, এই মুহুর্তে আপনার শরীরের ভেতর কোটিকোটি জীবানুর বিরুদ্ধে সে লড়ে যাচ্ছে।

আমরা নিজেদের শরীরের এই সিস্টেমটাকে মেরে ফেলি। বা দাঁড় হতে দেই না।
বাচ্চাকে কাদা লাগতে দেই না। মাটিতে নামাই না। স্ট্রিট ফুড খেয়ো না, ওখানে যেও না, ওখানে বসো না, ঐ জলে নেমো না বলে সীমারেখা বেঁধে দেই। ফলে আমাদের শরীর অধিকাংশ স্পেশাল জীবানুর সংস্পর্শেও আসে না, মেমরিও তৈরি হয় না। নতুন কোন প্রতিরক্ষা সিস্টেমও গজায় না। (বলছি না, এসব করুন। এ ব্যাপারে আরেকদিন লেখা যাবে)

সুইপারের বাচ্চাকাচ্চাদের এই সমস্যা নাই। দরিদ্র মানুষদের এই সমস্যা নাই। তারা সবকিছুর সংস্পর্শে আসে, সবাকিছুতেই আক্রান্ত হয়। স্পেশাল স্পেশাল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে তারা বেড়ে ওঠে। যে পরিবেশে আপনি আমি টিকতে পারব না, সেই পরিবেশে তারা টিকে থাকবে বছরের পর বছর, কোন সাপোর্ট ছাড়াই।
অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সি নিয়ে আমার লেখাটা ভাইরাল হবার পর চট্টগ্রামে একজন ফার্মাকোলোজি প্রফেসর আমার সাথে কথা বলেন। তিনি আমাকে শতশত কেইস হিস্ট্রি বলেন। তার শেষ কথা ছিল, ড্রাগ কিলস আস ফাস্টার দ্যান ডিজিস (রোগের চাইতে ঔষুধ আমাদের দ্রুত মেরে ফেলে)।
কখন ঔষুধ খাব, কখন খাব না এই বেসিক নলেজটা কীভাবে মানুষের মধ্যে ঢোকানো যায়, আমার ধারণা নাই। চেষ্টা করছি বুঝতে।
একবার যদি বোঝানো যেত… একবার যদি প্রয়োগ করা যেত… হেলথ সেক্টরের দানবগুলো মরে যেত রাতারাতি।

শেষ কথা?
নিজের শরীরকে প্রথম সুযোগ দিন ডাক্তারি করতে।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top