শিশুর প্রথম মায়ের কোল, প্রথম দুষ্টুমি

প্রথম শিশু নিয়ে মা-বাবার উৎসাহের কমতি থাকে না। নবজাতক ভূমিষ্ঠ হয়েই চিৎকার করে পৃথিবীকে জানায় তার আগমনবার্তা, আর এই চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে তার ফুসফুসে প্রথমবারের মতো বাতাস ঢোকে। এই প্রথম চিৎকার শিশুর জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণত জন্মের এক থেকে তিন মিনিটের মধ্যে শিশু চিৎকার করে, পাঁচ মিনিট পার হলে চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে। এ কারণেই প্রসবের সময় একজন চিকিৎসক বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স কিংবা ধাত্রীর উপস্থিতি এতটা জরুরি।
প্রথম মায়ের কোল: জন্মের পরপরই শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল মায়ের কোল। নবজাতকের দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণক্ষমতায় ঘাটতি থাকে, বিশেষ করে যারা সময়ের আগেই ভূমিষ্ঠ হয়। জন্মের পর সঙ্গে সঙ্গে মায়ের বুকে শিশুকে দেওয়া হলে মায়ের দেহের তাপমাত্রা তাকে যথেষ্ট উষ্ণ করে তোলে। নবজাতককে বাইরের লোকের সংস্পর্শে যত কম আনা যায়, ততই ভালো।
প্রথম দুধ: জন্মের পর থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধেই শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ হয়। এ সময় আর কোনো খাবারের প্রয়োজন নেই। কৌটার দুধ বা গরুর দুধ—কোনোটাই মাতৃদুগ্ধের বিকল্প হতে পারে না। মায়ের প্রথম দুধ বা শালদুধও শিশুর জন্য অত্যন্ত উপকারী। জন্মের পর যা প্রয়োজন, প্রচুর আমিষ ও যথেষ্ট রোগ প্রতিরোধক ইমিউনোগ্লোবিউলিন, তা শালদুধে আছে। শালদুধ হচ্ছে শিশুর প্রথম টিকা। এ দুধ কিছুতেই ফেলে দেওয়া যাবে না। প্রশ্ন হলো, কখন খাওয়ানো শুরু করবেন? উত্তরটা হচ্ছে—জন্মের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মায়ের দুধ দেওয়া উচিত। অনেকে বলেন ৩০ মিনিটের মধ্যেই। বেশি সময় পেরিয়ে গেলে শর্করার অভাবে শিশুর খিঁচুনি হতে পারে।
প্রথম পরিপূরক খাবার: ছয় মাস বয়সের পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুকে একটা করে নতুন খাবারের সঙ্গে পরিচিত করে তুলুন। প্রথম দিকে অল্প একটু খাওয়াতেও অনেক সময় লেগে যায়, ধৈর্য ধরতে হবে। শিশু যখন দিনে দু-তিন চামচ খাবার খেতে শুরু করবে, তখন অন্য একটা খাবার এর সঙ্গে দিন। ধীরে ধীরে খাবারের ঘনত্ব বাড়ান। ৮ থেকে ১০ মাস বয়সে শক্ত দানাদার খাবার খেতে শুরু করলে শিশু সঠিকভাবে চিবুতে ও খাবারের উপাদান বুঝতে শিখবে। এক বছর বয়সে শিশু হাত দিয়ে খাবার ধরে খেতে শেখে। এ সময় ফল বা সবজির টুকরো, রুটি বা নরম বিস্কুট হাতে ধরিয়ে দিলে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় বাড়বে।
প্রথম টিকাগুলো: শিশুর জন্মের আনন্দে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভুলে গেলে চলবে না। এর মধ্যে একটা হলো সঠিক সময়ে টিকাগুলো দেওয়া হলো কি না খেয়াল করা। কোনো কোনো টিকা জন্মের পর বা প্রথম দিনেই দেওয়ার কথা। তারপর আবার কবে কোনটা দিতে হবে, তার একটা তালিকা নেওয়াও জরুরি। সদ্য প্রসবের পর এই খুঁটিনাটি বিষয় মায়ের চেয়ে একজন বাবাই বেশি খেয়াল করবেন। নতুন বাবাকে এ সময় দায়িত্বশীল হতে হবে।
প্রথম কথা, প্রথম দুষ্টুমি: এক বছর পেরোলে শিশু হাঁটতে শেখে, তার মুখে কথা ফোটে, বিকশিত হতে থাকে ব্যক্তিত্ব। এই ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভাকে সঠিকভাবে বিকশিত হতে দেওয়ার দায়িত্ব মা-বাবার। তার জন্য চাই যথেষ্ট মানসিক প্রস্তুতি। সারাক্ষণ এটা করো না, ওটা ধরো না, ওখানে যেয়ো না—এসব কথা শিশুর স্বাধীন চিন্তা ও স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করবে। শিশুর দুরন্তপনা বা দুষ্টুমি তার ‘বেয়াদবি’ বা ‘বিপথে যাওয়া’ নয়, এটাই তার স্বাভাবিক আচরণ। অতি প্রশ্রয় বা অতি শাসন—কোনোটাই নয়, শিশু-মনস্তত্ত্বের দিকে খেয়াল রেখে গড়ে তুলুন তাকে।
ডা. এম আর খান
জাতীয় অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top