যে চাপে দিশেহারা শিশুরা

ফাহিম রহমান (ছদ্মনাম), রাজধানীর একটি নামকরা স্কুলের শিক্ষার্থী। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ফাহিম রোজ সকাল সাড়ে ছয়টায় ঘুম থেকে ওঠে। তাকে খাবার খেয়ে তৈরি হয়ে সকাল আটটার মধ্যে স্কুলে পৌঁছাতে হয়। বেলা দুইটায় ক্লাস শেষ। তারপর আধা ঘণ্টার বিরতি। স্কুলেই কোচিং করে সে; বেলা আড়াইটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত। বাসায় ফিরতে ফিরতে সাড়ে পাঁচটা।

আধা ঘণ্টা সময় মেলে হাতমুখ ধুয়ে খাবার খাওয়ার জন্য। সন্ধ্যা ছয়টায় গৃহশিক্ষক আসেন আরবি পড়াতে। তিনি যেতে না-যেতেই আরেকজন গৃহশিক্ষক হাজির। তাঁর কাছে পড়তে হয় রাত নয়টা পর্যন্ত। তারপর সারা দিনে আসে ফাহিমের কাঙ্ক্ষিত সেই এক ঘণ্টা, যে সময়টায় তাকে পড়তে হয় না। খেয়ে আর কম্পিউটারে গেমস খেলেই এ সময়টা কাটে। রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত মায়ের কাছে পড়ে ঘুমাতে যায় ফাহিম।
১২ বছর বয়সী ফাহিমের এভাবেই প্রতিদিন কাটে। শুক্রবার ছাড়া এই রুটিনের কোনো হেরফের হয় না। ফাহিমের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, সে টেলিভিশন দেখে না। সিনেমা দেখে না। শুধু পত্রিকাই নয়, পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোনো বই পড়ার সময়ও তার নেই। খেলাধুলা করে না। তবে শুক্রবার মাঝেমধ্যে বাইরে খেতে যায়।
তবু ফাহিমকে নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই মা-বাবার। প্রায়ই স্কুল থেকে ওর নামে অভিযোগ আসে। হোমওয়ার্ক ঠিকমতো না করা বা ক্লাসে মনোযোগী নয়—অভিযোগগুলো এমনই। গৃহশিক্ষকেরাও একই অভিযোগ করছেন। পড়াশোনায় মনোযোগী করার চেষ্টা করেও কোনো ফল হচ্ছে না। বরং ফাহিম এখন কথায় কথায় রেগে যায়, চিত্কার-চেঁচামেচি করে। আবার অনেক সময় জিনিসপত্রও ভাঙচুর করে।
এ অবস্থায় এক স্বজনের পরামর্শে মনোরোগবিদের শরণাপন্ন হন ফাহিমের মা-বাবা। এখনো ফাহিম তাঁর কাছে চিকিৎসাধীন। ফাহিমের চিকিৎসক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন কাউসার জানান, পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপের কারণে ওর মনোজগতে একধরনের চাপ তৈরি হয়েছে, যা ওর বয়সের তুলনায় বেশি। তা ছাড়া সারা দিনে ওর বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই, যা ওর মধ্যে কিছু মানসিক সমস্যা তৈরি করেছে। এ রকম চলতে থাকলে একসময় ফাহিম মানসিক রোগী হয়ে যাবে বলে মা-বাবাকে সতর্ক করেছেন এই চিকিৎসক। সালাহ্উদ্দীন বলেন, বর্তমানে এ ধরনের সমস্যা নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ফাহিমের দৈনন্দিন তালিকার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এ বিষয়ে ওর মায়ের কথা, পিএসসিতে ফাহিম জিপিএ-৫ পায়নি। মানসিক রোগ হোক আর যা-ই হোক, পরীক্ষায় ওকে ভালো করতেই হবে।
সন্তানের সুস্থ ভবিষ্যতের থেকে ভালো ফল কি বেশি প্রত্যাশিত? প্রশ্নটি করি মাকে। তিনি বলেন, ভালো ফল না হলে ওর ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ডুবে যাবে। কেবল তা-ই নয়, ওর মায়ের মধ্যে সন্তানকে নিয়ে একধরনের প্রতিযোগিতাও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ওর সব কাজিন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ওকেও পেতে হবে।’
শুধু ফাহিম নয়, দেশের অনেক শিশুই পড়াশোনার চাপে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। শিশু মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ-২০০৯ অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ শিশু মানসিক রোগে আক্রান্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট জরিপটি চালায়। যেখানে মেয়েশিশুর (১৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ) তুলনায় ছেলেশিশুদের মধ্যে (১৯ দশমিক ২১ শতাংশ) মানসিক রোগের হার বেশি। গবেষকেরা শিশুদের মধ্যে ২১ ধরনের মানসিক রোগের সন্ধান পেয়েছেন। বিষণ্নতা, অতিচঞ্চলতা, অবাধ্যতা, উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা, ভয় পাওয়া ইত্যাদি।
আট বছর বয়সী রিমা আলম তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। স্কুলে প্রতিদিনই তাকে কোনো না কোনো বিষয়ের ওপর পরীক্ষা দিতে হয়। এ ছাড়া হোমওয়ার্ক, ক্লাসওয়ার্ক, অ্যাসাইনমেন্ট তো রয়েছেই। কিন্তু পরীক্ষা দিতে মোটেও ভালো লাগে না ওর। ফলে নিয়মিতই মা-বাবার বকাঝকা খেতে হয়। তবু পড়তে চায় না রিমা। তেমন কথাও বলে না। কেমন চুপ করে বসে থাকে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক আহমেদ হেলাল এ বিষয়ে বলেন, স্কুলে পড়ার চাপ বৃদ্ধি ও সন্তানদের নিয়ে মা-বাবার মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের কারণে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ হচ্ছে না। দিন দিন অসহায় হয়ে যাচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। বেশির ভাগ শিশু এই পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। ফলে তাদের মধ্যে একধরনের হতাশা তৈরি হয়। সামাজিক সম্পর্ক গড়তে ব্যর্থ হয়। মানবিক গুণাবলি হারিয়ে ফেলে। আবেগের অস্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এমনকি অনেক সময় মাদকাসক্তও হয়ে পড়ে। এ ধরনের সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে বলে জানান তিনি। আর এতে নানা মানসিক সমস্যায় ভোগার পাশাপাশি শিশুর মানসিক রোগের ঝুঁকি অনেকাংশেই বেড়ে যাচ্ছে।
তাই অভিভাবককে এখনই সচেতন হতে হবে। নিজের সন্তানের সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে পড়াশোনার চাপ কমাতে হবে। আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে শিশুর মানবিক গুণাবলি বিকাশে।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top