অবিশ্বাস্য গল্প বলেছি বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে : রাশিদা সুলতানা

জাহিদ সোহাগ : ২০১৩ সালে ‘সাদা বিড়ালেরা’র পর এবছর প্রকাশিত হচ্ছে আপনার দ্বিতীয় উপন্যাস। মোটামুটি দীর্ঘবিরতি। এসময় কী করেছেন আপনি? নতুন উপন্যাস কখন লিখতে শুরু করলেন? নাম ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে চাই।
রাশিদা সুলতানা : ‘সাদা বিড়ালেরা’ প্রকাশিত হওয়ার পর মনে হয়েছে আর কিছুই লিখব না। পাঠকেরা ‘আমার গল্পগুলো’ এবং ‘সাদা বিড়ালেরা’র লেখক হিসেবেই আমাকে চিনুক। প্রতিবছর আমার গল্পের বই বা উপন্যাস বের হবে এমনটা কখনো চাইনি। আমার মধ্যে দ্বিধা ও ভয় ছিল ‘সাদা বিড়ালেরা’ এবং ‘আমার গল্পগুলো’ যতটা সাহিত্যমানসম্পন্ন হয়েছে বা পাঠককে আন্দোলিত করেছে আমার পরের উপন্যাস যদি সেই উচ্চতায় না পৌঁছায় তাহলে উপন্যাস লিখে লাভ কী।
আমার নতুন উপন্যাস ‘শূন্যমার্গে’র প্রধান চার চরিত্র রামিম, শিউলি, মিজান এবং নাজিয়া ২০১৩-র শেষদিকে আমার মাথায় আস্তানা গেড়ে বসে। আমি তখন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন দারফুর রিজিওনাল এডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে কাজ করি। অফিসে কাজের ব্যস্ততা ছিল। উইকএন্ডে উপন্যাসটা নিয়ে ভাবতাম আর নোট লিখে রাখতাম। ছুটির দিন এবং অফিসের পর অবসর সময় এই উপন্যাসের চরিত্র আর আখ্যান নিয়ে কেটেছে।
এই উপন্যাসটি নীরিক্ষাধর্মী। গতানুগতিক উপন্যাসের মতো না। ‘সাদা বিড়ালেরা’ লেখার সময় যেমন ঝুঁকি নিয়েছি পাঠক অবিশ্বাস্য গল্প গ্রহণ করবে কিনা, এই উপন্যাসেও তেমনি ঝুঁকি নিয়েছি, অবিশ্বাস্য গল্প বলেছি, যতটা সম্ভব বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে। আমার প্রিয় লেখক সালমান রুশদি এক উপন্যাসে অনেক আখ্যানকে জাদুকরি ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করেন, এটা আমার দারুণ লাগে। আমার নতুন উপন্যাসে অনেক আখ্যান নিয়ে কাজ করেছি। এক আখ্যান থেকে আরেক আখ্যানে শব্দ বয়ে গেছে। উপন্যাসে কাহিনি একবার শেষ হয়ে নতুন জীবন পেয়েছে। প্রধান চরিত্র দুজন নারী যাদের জীবন একটি পুরুষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।
শিউলি ও নাজিয়া এই উপন্যাসের অদ্ভুত নায়ক, রামিমের অনুরক্তা এবং তার উপেক্ষার নির্মম শিকার, তারা একেবারেই আলাদা চরিত্র, সচরাচরের বাইরের দুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং একইসঙ্গে ভীষণ শক্তিশালী এবং ভীষণ ভঙ্গুর মানুষ। উপন্যাসটিতে আরো আছে সমসাময়িককালের এক বিদ্রোহের আখ্যান।

জাহিদ সোহাগ : আপনি প্রথমে কবিতা লিখতেন, আপনার ভাষায়— আবেগে টুইটুম্বুর অথচ কোনো ইঙ্গিত, দ্ব্যার্থবোধকতাহীন কবিতা—সেসব কবিতা কি প্রকাশিত হয়েছিল? এখনো লেখেন?
রাশিদা সুলতানা : ১৯৯৮/৯৯ সালের দিকে যখন কবিতা লিখতে শুরু করি সেসময়ের প্রায় সব কবিতাই ছিল আবেগে টুইটুম্বুর এবং কোনো ইঙ্গিত ও দ্ব্যার্থবোধকতাহীন কবিতা। ঐ কবিতাগুলো কোথাও ছাপা হয়নি। পরবর্তীকালে আরো কবিতা লিখি। দৈনিক প্রথম আলোর সাহিত্যপাতায় চার-পাঁচটা কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। আমার কবিতার বই ‘জীবন যাপন দখিন হাওয়া’ প্রকাশিত হয় ২০০৮-এ। এখন আমার মনে হয় বইটিতে কিছু দুর্বল কবিতাও ছাপা হয়েছে। বইটি হয়তো আরো কয়েক বছর পর প্রকাশ করা উচিত ছিল। ২০০৮-এর পর আমার আর কবিতা লেখা হয়নি। ২০০৯-এ প্রকাশিত হয় গল্পের বই ‘পরালালনীল’, ২০১২-তে ‘পাখসাট’ আর ২০১৩-তে উপন্যাস ‘সাদা বিড়ালেরা’। ২০০৮-এর পর আমি পুরোপুরি ডুবে যাই গল্প এবং উপন্যাস লেখায়। এরপর আর কবিতায় ফেরা হয়নি। এই সময়টা জাতিসংঘ শান্তি মিশন দারফুর এবং পূর্ব তিমুরে কাজ করতাম। অফিসের কাজের পর লেখালেখির জন্য সময় বের করতাম।
কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘বোধ, অনুভব এসব থাকে কবির ও তার পাঠকের মনে— কবিতায় নয়। কবিতা যেন এক যুদ্ধবন্দি সংকেতলিপি পাঠিয়েছে আরেক যুদ্ধবন্দিকে। একজন এনকোড করছে, আরেকজন করবে ডিকোড। তো লিপিটা যতটা সুলিখিত হবে, ততই আরো বেশি অর্থবহ ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে তার।’ পাঠকের কাছে পাঠানোর মতো সুলিখিত সংকেতলিপি বা কবিতা লেখার সাহস এবং ক্ষমতা দুটোই এখন আমার আর নাই। চেষ্টা করি গল্প, উপন্যাসে কবিতা ও আখ্যানের ফিউশন করতে।

জাহিদ সোহাগ : আপনাকে আমরা লেখক হিসেবে প্রায়-আকস্মিকভাবে পাই। আমাদের দেশে লেখকরা লিটলম্যাগাজিনে লেখা ছেপে— যেটা তাদের কাছে আন্দোলন— ধীরে ধীরে নিজেকে প্রকাশ করেন। আপনার ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকে লেখা ছাপা হয় এবং আপনি দ্রুত পাঠকের কাছে চলে আসেন। ব্যাপারটা কি মিরাকল মনে হয়? প্রথম গল্পটি ছাপা হবার দিন সকালবেলা উত্তেজনা কেমন ছিল?
রাশিদা সুলতানা : ২০০০ সালের শেষদিকে এক সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই আমার জীবনের প্রথম গল্প ‘প্রত্যাখ্যাতা প্রতিশ্রুতা’ লিখে ফেলি। এর আগে কখনো আমি গল্প, উপন্যাস লিখব এমন ভাবিনি। ২০০১-এর জানুয়ারিতে এ গল্পটি ছাপা হয় প্রথম আলোর সাহিত্যপাতায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়াশোনা করি অর্থনীতি বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কোনো কবি বা কথাসাহিত্যিকের সাথে আমার পরিচয় হয়নি। ‘প্রত্যাখ্যাতা প্রতিশ্রুতা’ যখন লিখি লিটলম্যাগ আন্দোলন সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। প্রথম গল্প লেখার পর আমার মনে হলো দৈনিক প্রথম আলোর সাহিত্য সম্পাদকের কাছে নিয়ে যাই। দৈনিক প্রথম আলোর অফিসে গিয়ে কবি, লেখকদের সাথে প্রথম পরিচয় হয়।
২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত বছরে তিন-চারটা গল্প প্রথম আলোর সাহিত্যপাতায় ছাপা হয়েছে এবং আমি দ্রুত পাঠকের কাছে পৌঁছে যাই। পাঠকের অনুপ্রেরণায় লেখক হয়ে উঠি। সেসময় অনেক কবি লেখকের সাথে পরিচয় হয়েছে।
আকস্মিকভাবে আমার লেখক হয়ে ওঠা ছিল প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পাওয়া। আমি শুধু আমার কাজটাই করে গেছি। নিয়মিত গল্প লিখে গেছি। সেই সময় গল্পগুলো পাঠকের ভালো লেগেছে। কবি, কথাসাহিত্যিক, চলচ্চিত্র পরিচালক, সাধারণ পাঠক সবাই আমাকে নিয়মিত লেখার জন্য অনুপ্রেরণা দিয়েছেন।
২০০১/২০০২-এ লিটলম্যাগাজিন আন্দোলন এবং তাদের প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা সম্পর্কে জানতে পারি। যারা লিটলম্যাগাজিন আন্দোলনকে জীবনচর্চা হিসেবে নিয়েছেন তাঁদের প্রতি আমার অসীম শ্রদ্ধা।
যেদিন আমার প্রথম গল্প দৈনিক প্রথম আলোয় ছাপা হয় আমার বন্ধু আপনজন সবাইকে ফোন করে বলছিলাম গল্পটা পড়ার জন্য। সারা দিন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম।

জাহিদ সোহাগ : আপনার লেখায় শহুরে উচ্চবিত্তের জীবন লক্ষ করা যায়। এক অর্থে বাংলা কথাসাহিত্য দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের জীবনের আধার, যেন এরা ছাড়া সাহিত্য তার কুলীনতা (?) রক্ষা করতে পারে না, আপনার ক্ষেত্রে অনেকটা ব্যতিক্রম, কিভাবে? ‘সাদা বিড়ালেরা’য় দেখি একটি আন্তর্জাতিক ক্যানভাস।
রাশিদা সুলতানা : বাংলা সাহিত্যে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের জীবনের গল্প তুলনামূলকভাবে বেশি লেখা হয়েছে। লেখকের জীবন, অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নানা মন্বন্তর, রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম— এসবের আছর লেখকদের ওপর পড়েছে বলেই লেখকরা খেটেখাওয়া সংগ্রামী মানুষদের গল্প বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন। অন্যদিকে বিশ্বায়ন, জাদুবাস্তবতা, অস্তিত্ববাদ, পুঁজিবাদের বিজয়— এসবের প্রভাব ও লেখকের ওপর পড়েছে।
আমার অস্তিত্ববাদী গল্প-উপন্যাসে শহুরে উচ্চবিত্তের জীবনের গল্প যেমন লিখেছি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের গল্পও লিখেছি। সমাজের যে শ্রেণির গল্পই লিখি না কেন চেষ্টা করেছি লেখাটি যেন সাহিত্যমান-সম্পন্ন, শিল্পোত্তীর্ণ হয়। যেন পাঠকের মধ্যে মুক্তির বোধ জাগায়। ‘মুক্তি, বাস্তবের থেকে, নানা অনাবশ্যক আড়ম্বর আর গূঢ়ৈষা থেকে, নিজের মুখোশের, বর্মের, “প্যর্সনালিটি”-র থেকে স্বপ্নের বা স্বপ্নকল্প এক উন্মোচনের ভিতর’।
এককালে সাহিত্য রচিত হতো রাজা-রানি এবং সমাজের উচ্চবিত্তদের কাহিনি নিয়ে। সেসময়ও বহু ক্লাসিক সাহিত্য রচিত হয়েছে।
আমার জীবন-অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ, চারপাশের হাহাকার, অস্থিরতা আমাকে প্রভাবিত করে। কাছ থেকে রুগ্ন, অপুষ্ট রিকশাওয়ালা, গার্মেন্টকর্মীদের জীবন দেখি, বুঝতে চেষ্টা করি। আবার একমাসে তেরোপার্বন লেগে থাকা, মেহেদি সন্ধ্যা, গজলসন্ধ্যা, বসন্ত উৎসবে মেতে থাকা উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের জীবনকেও কাছ থেকে দেখি। ঢাকা ছেড়ে দারফুরে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে কাজ করতে গিয়ে দুই বেলা শুকনা রুটি খেয়ে বেঁচে থাকা দারফুরের মানুষদের দেখেছি, পানির অভাবে দিনের পর দিন গোসল করতে না পারা আর পুষ্টির অভাবে জীর্ণ মানুষেরাও তাদের মতো বেঁচে থাকে। ধুলায় আচ্ছাদিত শিশু-কিশোরেরা দিনভর খেলায় মেতে থাকে। জাতিসংঘের সহকর্মীরা সারা দিন অফিস শেষে সন্ধ্যায় আড্ডা, উৎসব, হাসি, হুল্লোড়ে মেতে উঠেছে। তাদের বিচ্ছিন্নতাবোধ, হতাশা, বন্ধুত্বের উদযাপনও কাছ থেকে দেখেছি।
দারফুরে অভ্যন্তরীণ সংঘাতে বাস্তুচ্যুত মানুষেরা অনেকেই বাবা-মা, স্বামী, স্ত্রী, সন্তান হারিয়েছেন। এসব স্বজনহারা মানুষেরা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বহু তরুণী, ফুফু, খালাকে দেখেছি বাবা-মা হারানো আট-দশজন এতিম শিশু-কিশোরের বাবা-মা হয়ে উঠতে, নিজেরা জাতিসংঘে বা অন্য কোথাও চাকরি করে এতিম শিশু-কিশোরদের লালন পালন করছে, তাদের স্কুলে পাঠাচ্ছে।
জাতিসংঘ শান্তি মিশন দারফুরে কাজ করেছি দশ বছরের বেশি সময়। পূর্ব তিমুরে এক বছর। জাপানে আড়াই বছর কাটিয়েছি। জাপান ডেভেলপমেন্ট স্কলারশিপে দুই বছরের মাস্টার্স করেছি। ফলে আন্তর্জাতিক ক্যানভাসে গল্প, উপন্যাস লেখা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়েছে। জীবনকে আমি বিচিত্র প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দিক থেকে দেখেছি।

জাহিদ সোহাগ : উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা দরিদ্রের জীবনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন— প্রেম, প্রতারণা, অবদমন বা অন্যান্য স্খলন সবার ক্ষেত্রে প্রায় একই, শুধু পরিপ্রেক্ষিত ভিন্ন, নাকি আলাদা কিছু মনে হয় তাদের জীবন?
রাশিদা সুলতানা : প্রেম, অবদমন— এসবের যেমন সার্বজনীন চেহারা আছে তেমনি আবার প্রেম, অবদমন, প্রতারণা, স্খলন প্রতিটা মানুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন অভিজ্ঞতা হতে পারে। একজন মানুষ যেমন আরেকজন মানুষের মতো হয় না, তেমনি এই অভিজ্ঞতাগুলো প্রতিটা মানুষের আলাদা হয়। নৈতিকতা, মূল্যবোধের ভিত্তিতে স্খলনকে দেখা হয়। আবার দুর্নীতির মতো সর্বব্যাপী, সর্বগ্রাসী স্খলনকে আমাদের সমাজে প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ হিসেবে দেখা হয়। উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত-দরিদ্র সব শ্রেণিতেই প্রেম, অবদমন, স্খলন, প্রতারণার হাজার রকমের চেহারা আছে। কিন্তু প্রেম সমাজের সবচেয়ে ধনী মানুষটিকে যেভাবে সুখী আর উদ্ভাসিত করে ঠিক একইভাবে হাড়-জিরজিরে, অপুষ্ট, দরিদ্র মানুষটিকেও সুখী, উজ্জ্বল আর উদ্ভাসিত করে তোলে। প্রেম, প্রতারণা, স্খলন অবদমনের নানা রূপ শিল্প, সাহিত্য, সিনেমায় কবি, লেখক, চলচ্চিত্র পরিচালকেরা মূর্ত করে তোলেন সুনিপুণ দক্ষতায়।

জাহিদ সোহাগ : আপনার নতুন উপন্যাসের সাফল্য কামনা করি। উপন্যাসটি পড়ার পর দীর্ঘ পরিসরে নিশ্চয়ই আলাপের সুযোগ তোলা রইলো। আজ এই পর্যন্তই, ধন্যবাদ আপনাকে।
রাশিদা সুলতানা : ধন্যবাদ আপনাকেও।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top