বউ ঘুমায়া যাওয়ার পরে বাংলাদেশের চ্যানেল দেখি…

ভরদুপুরে ধানমন্ডির ২৭ নম্বর রোডের কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে ৩০ থেকে ৩২ বছর বয়সি মো: সিরাজুল ইসলাম রিক্সায় বসে আছেন। না, তিনি প্যাসেঞ্জার নন, বরং তিনিই এই রিক্সার চালক। এইরকম আলসে দুপুরে রিক্সাচালক সিরাজুল ইসলামের সাথে কথা হয় তার জীবনে বিনোদনের প্রভাব নিয়ে। কথা হয় তার জীবনে প্রভাব বিস্তার করে থাকা বাংলাদেশের নাটক, সিনেমা আর গান নিয়ে।

প্রথমেই সোজা বিনোদন নিয়েতো আর কথা বলা যায় না, তাই রিক্সাচালক সিরাজের জীবন নিয়ে কথা জুড়ে দিলাম। জানাগেলো গত দুই বছর ধরে সিরাজুল ইসলাম ঢাকা শহরে রিক্সা চালান। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাটে। সিরাজুল ইসলাম আধবেলা রিক্সা চালান, আর আধাবেলা তাকে সাংসারিক কাজ করতে হয়। স্ত্রী পুরোদমে একজন গার্মেন্টস কর্মী।

সাংসারিক কাজ বলতে আপনি কি বোঝাচ্ছেন, এমন প্রশ্নে সিরাজুল ইসলাম যেনো একটু লজ্জা পেলেন। হেসে হেসে সিরাজ বললেন, ধরেন রান্দাভারা(রান্নাবান্না) থেইকা সব আমার করুন লাগে। মানে, মাছ কুঁটা থেইকা শুরু কইরা একেবারে কাপড় চোপর ধোয়া একেবারে টোটাল আমি করি। হে(স্ত্রী) সকালে ঘুম থেইকা উইট্টা(উঠে) নাস্তা খায়া কাজে চলে যায়। আবার ধরেন খাইতে দুপুরে বাসায় আসে, গরম ভাত-টাত রেডি, খায়া আবার গার্মেন্টসে চলে যায়, তারপর আমি রিক্সা লইয়া বের হই।
প্রতিদিনই কি এইরকম, স্ত্রীকে নিয়া সপ্তাহের কোনোদিন সিনেমা হলে কিংবা ঘুরতে যান না? জবাবে সিরাজুল বলেন, ‘নাহ! সময় কই’।

ঝিলিক গেছেগা, আবার আইছে কিরণ মালা…

‘বাংলা নাটক দেখেন কি না’ এমন প্রশ্নে সিরাজ বলেন, স্টার জলসা আমার ওয়াইফ বেশী ভালা পায়। সে থাকলে আর অইন্য চ্যানেল ঘুরাইতে দেয় না। আগে ঝিলিকের নাটক দেখতো, এহনতো ঝিলিক গেছেগা কিন্তু আবার আইছে ‘কিরণ মালা’ না কি যেনো। আরো দুইটা নাটক স্টার জলসায় আছে, ওইগুলি চললে মাইরাললেও চ্যানেল ঘুরান যাইতো না।

আপনি কি তাইলে আপনার ওয়াইফের সাথে স্টার জলসা-ই দেখেন; আপনারওতো চ্যানেল ঘুরানোর খায়েশ আছে, তাই না?

:আমার কথা হইছে, ধরেন আমি হইছি বাংলাদেশের মানুষ। হয় আমি বাংলাদেশের সিনেমা দেখবাম, বাংলাদেশের খবর দেখবাম না হইলে বাংলাদেশের নাটক দেখবাম। মানে চ্যানেলগুলি ঘুরাইয়া দেখবাম যে, কোনটার মধ্যে ভালা কিছু অইতাছে, আমি ওইটাই দেখবাম। কিন্তু ওয়াইফের লাইগ্যা তা আর পারি না; ওরে আবার বাধাও দেই না। সারাদিন কাজ-টাজ কইরা আসে, আর তারে না করি না। আমিও ১০টা পর্যন্ত তার সাথে স্টার জলসা দেখি, চ্যানেল ঘুরায়া দিতে চাইলে রাগ করে। ও ঘুমায়া গেলে পরে আমি বাংলাদেশের চ্যানেল দেখি।

অতিরিক্ত বিজ্ঞাপনই বাংলাদেশের টিভিরে খায়া দিছে…

আরেকটা হইতাছে ধরেন, বাংলাদেশের টিভিগুলাতে একটা খারাপ দিক আছে, ভারতের চ্যানেলগুলাতে যে বিজ্ঞাপন দেয়, বড়জোর ৩মিনিট বা ২মিনিট। এরা এইটা দেহায়া(দেখিয়ে) দিতাছে; আর আমরার বাংলাদেশের এইগুলি যদি বিজ্ঞাপন ছাড়ে এই ধরেন আজকে বেইল্যা (আজ সারাদিন) গেলেও তাগোর খুঁজ নাই। এইসব কারণেই বাংলাদেশের চ্যানেলগুলা খায়া দিছে। আমার এক নম্বর যুক্তি হইতাছে এইটা। বাংলাদেশের নাটকগুলিও অনেক ভালা আছে, এতো বিজ্ঞাপনের জইন্য খালি মানুষের বিরক্ত লাগে। এহনো যদি বাংলাদেশে দুই মিনিট কইরা বিজ্ঞাপন দেয়, ভারতের নাটকগুলির আর টাইম থাকতো না।

স্টার জলসা কিন্তু বিরাট মার্কেট পাইছে…

ভারতের স্টার জলসার মধ্যে যে নাটকগুলা অইতাছে, এইগুলা কিন্তু ভালো মার্কেট পাইছে। এহন আমরার বাংলাদেশে কিন্তু এইগুলা করতে পারে। বাংলাদেশে এইগুলি করলে আরো ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রী আমগোর এইহানে আছে, ওরারে দিয়া যদি করাইতে পারে তাইলে ভারতের চেয়ে আমরারগুলিই আরো বেশী চলবো।

বাংলা নাটকে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করায়ও রিক্সাওয়ালা সিরাজুল ইসলাম মহা বিরক্ত, বাংলা নাটকে তিনি অকারণে হাসাহাসি ব্যাপারাটাও পছন্দ করেন না; বরং স্টার জলসার নাটকের মতো নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তদের সাংসারিক খুঁটিনাটি, সংকট আর কূটনামিগুলিও বাংলাদেশের নাটকে দেখতে চান তিনি। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, মানুষরে হাসানির লাইগ্যা নাটকে এহন নোয়াখাইল্যা, বরিশাইল্যা ভাষা দেয়; এইটা কিন্তু নাটক না।সংসারের বা একটা ফ্যামিলির ঘরের ভিতরে কিভাবে চলতাছে, অভাব নাকি সুখে আছে এইগুলা বিষয় নিয়া যদি আপনের বাংলাদেশের নাটকগুলা হয়, তাইলে বেশী ভালা’।

হিন্দি ফাইটিং সিনেমা ছাড়া অন্যকিছু দেখি না, বুঝি নাতো…

না, হিন্দি সিনেমা বুঝি কম।কিন্তু তারপরেও ফাইটিং সিনেমা হইলে দেখি। এইটা যে আমার দেখতেই হইবো, এইরকম কোনো কথা নাই।

আর বাংলা সিনেমা…?

ওইযে কইলাম, সময় পাইলে রাত্রে বাসায় যায়া দেখি। বাংলাদেশের মধ্যেতো শুধু ‘মাইটিভি’তে রাইতের বেলায় বাংলা ছবি দেয়। মাঝে মাঝে এইটাতেই দেখি। অন্যান্য চ্যানেলগুলোতেও রাইতে ছবি দেয়া দরকার। আমরা যারা পুরুষ মানুষ কাজ করে রাইতে বাসায় যাই, তাদের জইন্য হইলেও টিভিতে দিনের অনুষ্ঠানগুলি রাইতে পুনপ্রচার দেওন দরকার। ভারতের টিভিগলাতে তো দেয়।

নায়িকা পপি’র কোনো সিনেমা-ই ছাড়ি নাই…

এইরকম কোনো নায়িকা আছে, যে আপনার ঘুম হারাম করে দিছে? এমন প্রশ্নের পর হু হু করে হেসে উঠলো সিরাজুল ইসলাম। তবে সে ভাবতে লাগলো…। একটু পর সিরাজুল ইসলাম বললো, ঘুম হারাম করে নাই ঠিক, তবে ‘কুলী’ নামে একটা সিনেমা হইছিলো; ওইটাই নায়িকা পপি’র অভিনয় খুব ফাইন লাগছিলো। একবারে ধরেন, হৃদয় কাইড়া লইছিলো। এরপর পপির আর কোনো সিনেমা-ই আমি মিস্ দেই নাই। এছাড়া ধরেন, শাবনূররে একসময় খুব ভাল লাগতো।পূর্ণিমার ছবিও দেখছি অনেক।

এখন আপনার কাকে ভাল লাগে?

: এখনতো সিনেমা হলে যায়া সিনেমাই দেখি না। তারপরেও ঈদের সময় বাড়িতে গেলে বন্ধু বান্ধব মিইল্যা ফুলপুরের সিনেমা হলে ভালো ছবি আনলে দেখি। শাকিব খান, অপু বিশ্বাসরে ভাল লাগে। তারাই এহনের বাংলা সিনেমায় ১নম্বরে আছে।
আরোতো নতুন নায়ক-নায়িকা বাংলাদেশে আসছে। মাহি, পরী মনি এদের চিনেন?

:হ, টিভিতে এদের গান-টান দেখি। কিন্তু তাগোর ছবি দেখি নাই(হাসি…)। তয় এহনের থেইকা আগের নায়িকারাই বেশী ভালা ছিলো, সামাজিক ছবি করতো। শরীর ঢাইক্যা(ঢেকে), পর্দানশীলভাবে ছবিগুলি করতো; আর এহনতো অর্ধেক কাপড় দিয়া ঢাকে, আর অর্ধেক খালি রাইখ্যা দেয় শরীর দেখানোর লাইগ্যা।

আচ্ছা সিরাজ ভাই, আপনার এইগুলি দেখতে মন চায় না?

:আমিতো দেখি-ই। কিন্তু এইগুলাতো সমাজের জন্য ভালা না। পাপ! এইজইন্যতো মানুষ ছবি দেহা ছাড়ছে। হলে যায় না। আগে মান্নার কি ভালা ছবিই না ওইতো(হতো)। সমাজের সমস্যা-টমস্যা সবকিছু ছবিতে তুইল্যা ধরতো, আইনশৃঙ্ক্ষলা তুইল্যা ধরতো, আর মান্নার কি ডাইলগ ছিলো; এইগুলি এহনের ছবিতে আপনি পাইবেন খুঁইজ্যা। এই মান্নার ছবি দেহনের লাইগ্যা(দেখার জন্য)আমি হালুয়াঘাট থেইকা প্রতি সপ্তাহে ফুলপুর সিনেমা হলে চলে যাইতাম। মানুষের হুট-হরমাইশ (ফরমায়েশ) কইরা টাকা জমা্য়তাম, দশ টাকা হইলেই সোজা কোনো কথা নাই, একেবারে সিনেমা হলে।
নায়িকারাও স্বচ্চরিত্রভাবে কইরা যাইতো। আর এখনতো হাফ-প্যান্ট পইরা নাইচ ছাড়া আর কিছু নাই। মান্না, রুবেল, রিয়াজ, শাকিল খানের মতো নায়কওতো নাই।

কোনো দিকে মনির খানের গান শুনলে এখনো মনটা ছেদ্ কইরা উঠে…

আচ্ছা, সিরাজ ভাই; নাটক সিনেমাতো গেলো, এইবার আপনার গান কার ভাল লাগতো বা এখনো ভাল লাগে, বলবেন?

:রিক্সা চালানোর আগে বাড়িতে থাকতে একটা হোটেলে কাজ করতাম। ওই সময় মনির খানের গান চারদিকে সবাই শুনে। ওই হোটেলেই আমরা কয়জন মিইল্যা একটা টেপ(টেপ রেকর্ডার) কিনছিলাম। আর সারাক্ষণ হুনতাম(শুনতাম) মনির খানের গান। মনে হয়, মনির খানের সব গান আমার হুনা(শুনা)। এখনো যখন রিক্সা চালাইতে চালাইতে কোনো দোকান-টোকানে মনির খানের গান শুনি, মনটা একেবারে ছেদ্ কইরা উঠে।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top