সব পোশাকেই বর্ষবরণ

পাঞ্জাবি তো বৈশাখেরই। তাই বলে এদিন কি অন্য পোশাক পরতে মানা? বৈশাখের নকশা তো আর শুধু পাঞ্জাবির গায়েই লেগে নেই। তা এখন ছড়িয়ে গেছে টি-শার্ট, ফতুয়া বা শার্টের মতো পোশাকেও। বিশেষ করে তরুণদের কথা ভেবেই ভিন্ন ভিন্ন পোশাকে বৈশাখের নকশা আঁকছেন ডিজাইনাররা। কী নেই এসব নকশায়। এবার প্রায় প্রতিটি ফ্যাশন হাউস ছেলেদের পোশাকের নকশা করেছে কোনো না কোনো বিশেষ থিম ধরে। সেখানে যেমন শখের হাঁড়ির রং লেগেছে পাঞ্জাবির জমিনে; তেমনি টি-শার্টের বুকের ওপরে বসেছে গোমড়া মুখের প্যাঁচা বা লোকজ মেলার রমরমা বাজার। লাল-সাদার একটা বড় সমন্বয় তো আছেই, সেখানে যোগ হয়েছে আরও কয়েকটি উজ্জ্বল রং। বিশেষ করে নীল রঙের তৈরি পোশাক এনেছে অনেক ফ্যাশন হাউস। পাঞ্জাবি, শার্ট ও ফতুয়ায় ব্যবহার হচ্ছে পিওর নীল রং। কখনো তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে লাল-সাদা বুটি, ব্লক ইত্যাদি। ছেলেদের পোশাকের রং নিয়ে ব্যাঙের প্রধান ডিজাইনার সায়েম হাসানও জানালেন একই তথ্য, বৈশাখে এবার নীল রঙের একটা প্রচলন দেখা যাচ্ছে ছেলেদের পোশাকে। লাল আর সাদা রঙের আবেদন বৈশাখে চিরন্তন। এই দুটি রঙেই আসল রূপ ফুটে ওঠে। তবে এ বছর নীল, কমলা, কচি সবুজের মতো রংগুলো থাকছে বাঙালির একান্ত উৎসবে।

রং নিয়ে তো একটা ধারণা পাওয়া গেল, কিন্তু পোশাকের ধরন হবে কী? পাঞ্জাবি পরে সারা দিন অনেকেই ঘোরাফেরা করতে স্বস্তি পান না। এ ছাড়া মুঠোফোন বা মানিব্যাগ রাখা নিয়েও বিপত্তি দেখা দেয়। আবার এটাও ঠিক যে সারা দিনে একবার পাঞ্জাবি না পরলেও ঠিক মন ভরে না অনেকের। বিশেষ করে কোনো দাওয়াতে বা বৈশাখের সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রায়। এরও একটা সমাধান দেখা গেল অনেক ফ্যাশন হাউসের পাঞ্জাবিতে। নতুন পাঞ্জাবির দুই দিকে থাকা পকেটের মধ্যে আলাদা একটা কাপড়ের চেম্বার করে মুঠোফোন বা মানিব্যাগ সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা থাকছে। পাঞ্জাবিকে বৈশাখের রঙে রাঙাতে ব্যবহৃত হচ্ছে নানা ধরনের মোটিফ।
লাল, সাদা বা নীল—একরঙা পাঞ্জাবি তো থাকছেই, বৈশাখ ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার হচ্ছে লোকজ মোটিফ। গ্রামীণ বাংলাদেশের ছোট ছোট নানা দিক উঠে আসছে ছেলেদের পোশাকে। টেপা পুতুল, শখের হাঁড়ি, সরা, নৌকা, ধানখেত, তালগাছ, মাছ, প্যাঁচা, কবিতার পঙ্‌ক্তি দিয়ে করা হচ্ছে ছেলেদের পোশাকের নকশা। পাঞ্জাবি, ফতুয়া বা টি-শার্টের এই ট্রেন্ড নিয়ে ফ্যাশন হাউস দেশালের ডিজাইনার ইশরাত জাহান বলেন, নানা ধরনের ফোক মোটিফ থাকছে বৈশাখের পোশাকে। দেশাল এসব ফোক মোটিফকে আবার খানিকটা নিজেদের মতো করে সংযোজন করে নকশা করছে বৈশাখের কাপড়ে। পাখি, নানা ধরনের মাছ ও প্যাঁচার আদলে বানানো হচ্ছে পাঞ্জাবি, ফতুয়ার মতো পোশাকগুলো।
অনেকেই বৈশাখে শখ করে ফতুয়া পরেন। ডিজাইনারদের পরামর্শ সেটা ফুলহাতা না পরে হাফ বা হাতাকাটা হতে পারে। ফতুয়ার সঙ্গে চাইলে একটা লুঙ্গি পরে মিশে যেতে পারেন মঙ্গল শোভাযাত্রায়। এতে শোভাযাত্রারও শোভা বাড়বে। ফিটিং ও লম্বা ঝুল দুই ধরনের ফতুয়াই চলবে বৈশাখে। এক রঙের স্ক্রিন প্রিন্ট করা বা নানা ধরনের গ্রামীণ চেকের সুতি ফতুয়াই ভালো দেখাবে পয়লা বৈশাখে। আর পাঞ্জাবির কাটে চলছে স্লিমফিট। ফ্যাশন হাউস ওটুর স্বত্বাধিকারী ও ডিজাইনার জাফর ইকবাল বলেন, ছেলেদের পাঞ্জাবির ঝুল খানিকটা কমে হাঁটুর একটু নিচে এসেছে। ঢিলেঢালা ভাব ছেড়ে এসব পাঞ্জাবিতে স্লিমফিট কাট জনপ্রিয় তরুণদের কাছে। কলার, বোতাম, পকেট বা বুকের সামনে বাটন প্লেটে ছোট ছোট পরিবর্তন পাঞ্জাবির চেহারা বদলে দিচ্ছে। ফতুয়ার চেয়ে একটু বড় ও নিচের দিকে খানিকটা গোলাকার কাটের পোশাক কাতুয়াও পরতে পারেন ছেলেরা। থ্রি-কোয়ার্টার হাতার এই নতুন পোশাকটাও বৈশাখের রং পেয়ে হয়ে উঠেছে বর্ণিল।
গত বছরের শেষ দিক থেকে জনপ্রিয়তা পাওয়া শার্টের প্রিন্ট এবার বৈশাখের টি-শার্টেও দেখা যাচ্ছে। কলকা প্রিন্ট, ডট প্রিন্ট, আবহমান বাংলার আলোকচিত্রসহ নানা ধরনের প্রিন্ট করা হচ্ছে টি-শার্টে। বিশেষ করে তরুণদের কথা মাথায় রেখেই নকশা করা হচ্ছে টি-শার্ট। ফ্যাশন হাউস নিত্য উপহারের স্বত্বাধিকারী বাহার রহমান বলেন, আলোকচিত্র দিয়ে টি-শার্ট করার চল বাড়ছে। তরুণেরাও পছন্দ করছেন। এ ছাড়া লোকজ মোটিফ বা আঁকা চিত্রকর্ম দিয়ে করা টি-শার্ট বৈশাখে দিব্যি মানিয়ে যাবে। এই সময়ের আবহাওয়া যেহেতু গরম, তাই পাতলা কাপড় বেছে নিতে হবে পোশাকে। পোলো বা গোল গলা—যে টি-শার্টই হোক, বৈশাখের রং বেছে নিলেই ভালো দেখাবে।
পাঞ্জাবি, শার্ট বা টি-শার্ট—যেটাই হোক, সেটা সুতি কাপড়ের হলেই ভালো বলে মনে করেন ডিজাইনাররা। আর তাই অধিকাংশ দোকানেই সুতি কাপড়কে প্রাধান্য দিয়ে পোশাক তৈরি করা হয়েছে। কাপড়কে পাতলা ও আরামদায়ক করতে সফটনার ওয়াশ বা সিলিকন ওয়াশ করা হচ্ছে।

দরদাম
এক বা দুই রঙের সাদামাটা পাঞ্জাবি হলে ৭০০ থেকে ১২০০ টাকা, ব্লক বা প্রিন্টের কাজ করা পাঞ্জাবির দাম পড়বে ১০০০ থেকে ৩০০০ টাকা, ভারী কাজ হলে দাম আরও হাজার খানেক বাড়াতে হবে। ফতুয়ার দাম পড়বে ২০০ থেকে ৬০০ টাকা, কাতুয়া হলে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি। টি-শার্ট হলে ২৮০ থেকে ৬০০ টাকা, পোলো শার্ট পাওয়া যাবে ৪০০ থেকে ১৩০০ টাকায়। এ ছাড়া শার্ট কিনতে চাইলে ৫০০ থেকে ২৫০০ টাকার মতো খরচ হবে।

যেখানে কিনতে পারেন
রাজধানীর নিউমার্কেটে গেলে ফ্যাশন হাউসের মতো ট্রেন্ডি পোশাক না খুঁজে রং ধরে কিনে আনতে পারবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের মধ্যে আড়ং, যাত্রা, ক্যাটস আই, ওটু, লা রিভ, দেশী দশের সব ফ্যাশন হাউস, বিশ্বরঙ, স্টুডিও এমদাদ, কুমুদিনী, ইয়েলো, স্মার্টেক্স, স্বদেশীর সব ব্র্যান্ডে, ইজি, মনসুন রেইন, আর্টিস্টি, লুবনান, ফ্রিল্যান্ড, এক্সট্যাসি, ইনফিনিটি, কাপড় ই বাংলা, নিত্য উপহার, আজিজ সুপার মার্কেটের বিভিন্ন দোকান, প্লাস পয়েন্ট, সেইলর, ট্রেন্ডসসহ বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে। এ ছাড়া এলিফ্যান্ট রোড, বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক, স্বপ্ন, রাপা প্লাজা, কারুপল্লীসহ বিভিন্ন সুপারশপে মিলবে বৈশাখের পোশাক।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top