শিশুর সাথে ভাল সম্পর্ক গড়বেন কীভাবে- জানুন এনএলপি বিশেষজ্ঞের মত

সন্তানকে ভালোবাসেন সকল অভিভাবকরাই। কিন্তু তাদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রায়ই তারা বেছে নেন ভুল পথ। ‘বাবা-মা যা করেন ভালোর জন্য করেন’- প্রচলিত এই প্রবাদটি গেঁথে আছে আমাদের সবার মনে। কিন্তু একটু সংশোধন প্রয়োজন। বাবা-মা যা করেন ভাল ফল হবে মনে করে করেন, কিন্তু ফলাফল বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ভাল হয় না এবং তারা জানতেও পারেন না তাদের ভুল সিদ্ধান্ত বা পথ নির্দেশনার কারণে কত বড় নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হয় সন্তানকে।

শিশুকে গড়ে তোলা, তার বিকাশের প্রতিটি স্তরে কীভাবে কী করা উচিৎ, না করলে কী ফল হতে পারে এর উপর রয়েছে অসংখ্য গবেষণা। এনএলপি বা নিউরো লিঙ্গুইস্টিক প্রোগ্রামিং যারা অনুশীলন করেন তাদের কাছ থেকে আমরা যুক্তিসঙ্গত দিকনির্দেশনা পেতে পারি। সেক্ষেত্রে প্রথমেই প্রশ্ন আসে এনএলপি কী? এনএলপি ৩টি বিষয় নিয়ে গবেষণা করে- নিউরোলজি, ভাষা এবং প্রোগ্রামিং। নিউরোলজিকাল সিস্টেম আমাদের শরীরের কার্যপ্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, ভাষা সেটাকে প্রকাশ করে এবং অন্যের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। আর প্রোগ্রামিং হল শরীরের ক্রিয়া এবং ভাষা মিলিয়ে আমাদের নিজেদের যে মডেল আমরা পৃথিবীর সামনে তুলে ধরি। তাহলে এক কথায়, নিউরো লিঙ্গুইস্টিক প্রোগ্রামিং ব্যাখ্যা করে মস্তিষ্ক (নিউরো) এবং ভাষা (লিঙ্গুইস্টিক) এর মৌলিক ডায়নামিক এবং কীভাবে তারা আমাদের শরীর এবং আচরণে প্রভাব ফেলে (প্রোগ্রামিং)।

জুডি বার্টকোয়াইক একজন এনএলপি কিডস কোচ, প্রশিক্ষক। তার লেখা বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘বি এ হ্যাপিয়ার প্যারেন্ট উইদ এনএলপি’, ‘এনএলপি ওয়ার্কবুক’, শিশু, কিশোরসহ সকল বয়সের মানুষের মানসিক যত্নে কীভাবে কাজে লাগতে পারে এনএলপি এই সংক্রান্ত সিরিজ। এছাড়াও অভিভাবককে সহযোগিতা করতে জুডি প্রতিনিয়ত লিখছেন বিভিন্ন আর্টিকেল। শিশুদের সাথে শুধু অভিভাবক নয় যে কেউ-ই যখন যোগাযোগ করবেন কীভাবে কথা বলা উচিৎ এই বিষয়ে জানব তার বক্তব্য-

শিশুদের সাথে কথা বলা বেশ কঠিন। বড়দের মত দায়িত্ববোধ থেকে তারা কাজ করে না। তারা কাজ করে তাদের ভাল লাগাকে কেন্দ্র করে। তাই তাকে যদি আপনি সরাসরি প্রশ্ন করেন তাহলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সে কোন উত্তরই দেবে না। তাহলে কীভাবে প্রশ্ন করবেন?

প্রথমে ঠিক করুন কী জানতে চান-
* আপনি কি তার দিনের ঘটনাগুলো জানতে চান? পরীক্ষায় কত নম্বর পেল বা শরীর খারাপ লাগছে কিনা?
* অথবা হয়ত আপনি তার মনের অবস্থা জানতে চান যেমন- স্কুল কেমন লাগলো তোমার বা ভাল আছ?
* নাকি আপনি শুধু কথা বলতে চান? যেমন- এই সপ্তাহে কী কী করলে?
* অথবা পরিচিত হতে চান মাত্র। যেমন- তোমার নাম কী?

কিছু প্রশ্নের উত্তর হবে হ্যাঁ অথবা না। এগুলোকে বলা হয় ক্লোজড কোশ্চেন অর্থাৎ একটা উত্তরের সাথেই আলাপ শেষ হয়ে গেল। আর কথা বাড়ানো যায় না। এধরণের প্রশ্ন করা মোটেই সমীচীন নয়। কারণ শিশুরা পালটা প্রশ্ন সাধারণত করে না। তারা তাদের খেলায় মত্ত থাকে। এক্ষেত্রে আরও কথা বলতে হলে আপনাকে আরও প্রশ্ন করতে হবে। আবার এ ধরণের প্রশ্নের ক্ষেত্রে তাকে চিন্তাও বেশি করতে হয়। কারণ তার কাছে দুই ধরণের উত্তর থাকে। একটি প্রকৃত উত্তর আর অন্যটি নিরাপদ উত্তর। এতে সে উত্তর দেওয়া এড়িয়ে যেতে পারে। তাই সরাসরি নয়, শিশুদের সাথে কথা বলুন নমনীয় ভাবে। একই প্রশ্ন একটু ঘুরিয়ে করুন।

আবার শিশুদের প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে বা তাদের কাছে কিছু জানতে হলে বর্তমান সময় নিয়ে কথা বলা ভাল। কারণ তারা দ্রুত নিজের মনোযোগ এক কাজ থেকে অন্য কাজে সরিয়ে নেয় এবং যা করে খুব মনোযোগ দিয়ে করতে থাকে। আমরা যদি তাকে ৪/৫ ঘন্টা আগে কী ঘটেছিল সেই প্রশ্ন করি তাহলে সে বিভ্রান্ত বোধ করবে, অনেক সময় হয়ত উত্তর দিতে পারবে না। এতে তাদের মস্তিষ্কে চাপ পড়ে। আমরা ভাবি, সে উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছে,কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়।

শিশুদের সাথে আলাপচারিতায় আপনি সবচেয়ে সহজ বোধ করবেন তখন যখন আপনি তার অবস্থান বুঝে সেখানে দাঁড়িয়ে তার সাথে কথা বলবেন। আপনি তার যত কাছেরই হোন না কেন সে ততক্ষণ আপনার ওপর আস্থা পাবে না যতক্ষণ আপনি তার মত একজন হিসেবে নিজেকে প্রকাশ না করবেন। সাধারণ হালকা কথা দিয়ে শুরু করুন। আগে তাদের আচরণ খেয়াল করুন, একটা হ্যালো বা ছোট্ট কোন সম্বোধন করুন, তারা যা করছে তার সম্পর্কেই কিছু জিজ্ঞেস করুন, সম্ভব হলে নিজেও একইরকম কিছু করুন।

বাবা-মায়েরা প্রায়ই অভিযোগ করেন তাদের সন্তান বাইরে থেকে ফিরলে বা অনেক সময় পর দেখা হলে সাধারণ হাসি বিনিময়ও করে না, বরং দৌড়ে খেলতে চলে যায় বা নিজের কাজে চলে যায়। মনে রাখবেন, শিশুরা যত্ন পেতে ভালোবাসে, আপনি সবসময়ই তাকে মনোযোগ দিচ্ছেন কিনা সেটা খেয়াল করে। আপনার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখলে সে মনে করে, সে হয়ত এমন কিছু করে ফেলেছে যা আপনাকে বিরক্ত করছে। অসুস্থ অবস্থা্য় চোখ মেলে আপনাকে দেখতে পেলে ভাবে, আপনি সারাক্ষণই তার পাশে ছিলেন। এই মনোযোগ একসময় আপনার প্রতিও তাকে মনোযোগী করে তুলবে।

খেয়াল করুন কোন প্রশ্নের উত্তরগুলো সে দেয়। সেভাবেই তাকে প্রশ্ন করুন। সবসময় আপনার কথা বলা, প্রশ্ন করার মাঝে প্রকাশ করুন যত্ন। কখনো যেন শিশুর মনে না হয়, আপনাকে সত্যি কথা বলা যাবে না। তাহলে দেখবেন আপনার শিশু কখনো আপনাকে মিথ্যা বলবে না। আবার একইসাথে তার সব কথাও জানতে পারবেন তার কাছ থেকেই। এই শিশুই বড় হয়ে আপনাকে জড়িয়ে ধরবে বন্ধুর মত।

ছবিঃ প্রিয়

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top