ঘরেবাইরে I আলোহাওয়ায় কারুকার্য

কর্মক্লান্ত দিনের শেষে ফিরে আসতে হয় নিজের শখের বাড়িতে। তাই জায়গাটি হতে হয় প্রশান্তিকর আর আরামদায়ক। ক্লান্তিহরা। তুতলী রহমানের বাড়িটি এমনই

গ্রীষ্মের ঝাঁজালো দুপুরে সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে ধরা দেয় নতুন দৃশ্যপট। সাদামাটা গড়ন ও সরল কাঠামোর বাড়িটি বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না, ভেতরে অপেক্ষা করছে পৌরাণিক এক আমেজ। প্রবেশমুখেই রয়েছে কারুকার্যময় খয়েরি রঙের বিশাল দরজা। পুরোটাই কাঠের। একই সঙ্গে জ্যামিতিক ও ফ্লোরাল অলংকরণ তুলে ধরা হয়েছে এতে। দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই আপনি অভ্যর্থিত হবেন কাঠের তৈরি বিভিন্ন আসবাব, বুদ্ধমূর্তি ও দেয়ালে টানানো বিভিন্ন অলংকরণের আয়না দেখে। মনে হতে পারে, প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতেই বাড়িটির যত আয়োজন। তবে কাহিনি কিছুটা ভিন্ন। সেটা জানা যায় বাড়ির মালিক তুতলী রহমানের কাছ থেকে। পেশায় যিনি ফ্যাশন ডিজাইনার। বাড়ির অভ্যন্তরীণ অন্দরসজ্জাও তাঁর সৃজনভাবনার প্রকাশ।

ঘটনার শুরুটা এ রকম: একবার তুতলী নেপাল দূতাবাস পার হচ্ছিলেন। তখন তাঁর চোখ পড়ে এর কারুকার্যময় কাঠের দরজা-জানালায়। তাঁকে আকৃষ্ট করে। অনুপ্রাণিত হন তিনি। সেই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উপাদানকে নিজের অন্দরের অংশ করে তোলার জন্য চলে যান নেপালে। সেখান থেকেই এগুলো তৈরি করিয়ে নিয়ে আসেন। বাড়িটির বিভিন্ন দেয়ালে টাঙানো শোপিসের মাঝে আলাদা করেই নজরে আসে কাঠের খিড়কির মতো দেখতে একটি শোপিস। যার গায়ে মোজাইক প্যাটার্ন খোদাই করা। খিড়কির হামল দুটি খুলে তাতে আয়না সেট করা। এটি নেপালের স্থানীয় আর্টওয়ার্কের মতো। এ ছাড়া দেয়ালে এনগ্রেভ করে বিভিন্ন মূর্তি বসানো। সবই নেপালের দারুশিল্প প্রভাবিত (কাঠের শিল্পকর্ম)। বাড়িটিতে নেপালিজ দারুশিল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ আমেজ পাওয়া যায় ডাইনিং হলে। বিশাল জায়গাজুড়ে পেতে রাখা কারুকার্যময় ডাইনিং টেবিল। এর স্বচ্ছ কাচের নিচে খয়েরি কাঠের বেজ। সেখানে রয়েছে এনগ্রেভড মোজাইক প্যাটার্ন, পায়াগুলোতে ফ্লোরাল অলংকরণের আভিজাত্য। সবার জন্য পেতে রাখা আসনগুলোতেও একই কারসাজি।

gore_baire_2আমোদিত হতে হয় বাড়ির লিভিং রুমে ঢুকেও। সেখানে উডওয়ার্ক ও জ্যামিতিক প্যাটার্নের আধিপত্যের মাঝে তুলে ধরা হয়েছে অ্যান্টিক ধাঁচের অন্দরসজ্জা। গতানুগতিক ধারা থেকে একটু দূরে। কাঠের কারুকার্যের আড়ম্বর দেখা যায় শোবার ঘরেও। পূব দিকের পুরো দেয়ালজুড়ে বিশাল কাঠের ক্লোসেট। দেয়ালে টুকটাক আর্টওয়ার্ক ও শোপিস। বেশ বড় আকারের আয়না, ব্যবহার্য জিনিসপত্রেও পৌরাণিকতার ছাপ। বিশাল খোলা স্নানাগার, সেখানকার কেবিনেটেও রয়েছে কাঠের কারুকার্য। শোবার ঘরের খাটের দু’পাশে মোমবাতির মৃদু আলোকসজ্জা কাঠের কারুকার্যের এই আভিজাত্যকে আরও উপভোগ্য করে তোলে।

এল-শেপড সিঁড়ি প্রবেশ করেছে বাড়ির ফ্লোরগুলোতে। সিঁড়িঘরেও সাজানো রয়েছে বুদ্ধমূর্তি। কিছু পৌরাণিক দেয়ালসজ্জা- দেখে মনে হতে পারে নিচে চলে গেছে আরেকটি অধ্যায়। ফুল-হাইট কাচের জানালাগুলোর স্বচ্ছতা অভ্যন্তরীণ ও বাইরের পরিবেশের মাঝে সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে। সিঁড়ি অতিক্রম করে প্রতিটি ফ্লোরে ঢোকার সময় রয়েছে লবির মতো বিশাল জায়গা, যাকে কেন্দ্র করে অন্য স্পেসগুলো প্রসারিত হয়েছে।

আমাদের দেশে নকশা প্রণয়নের সময় কিছু অপচর্চা দেখা যায়। বাড়ির এক্সটেরিয়র ভিউ পাওয়ার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা হয় না। অথচ খুব অল্প সময়ের জন্যই এই এক্সটেরিয়র ভিউ। মূলত বাড়ির সদস্যদের বসবাস করতে হয় অন্দরেই। তাই সেখানকার স্বাচ্ছন্দ্যই মুখ্য হওয়া উচিত। তবে এও নয় যে বাড়ির বাইরের কাঠামো ও স্থাপনা, উপস্থাপনা ও সৌন্দর্য বিবেচনার তালিকা থেকে বাদ যাবে। তবে চাকচিক্য বাড়াতে গিয়ে যাতে ভেতরকার বায়ুপ্রবাহ ও স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যাঘাত না ঘটে, সে সচেতনতা দরকার। নাতিশীতোষ্ণ বাংলাদেশে দিনের অনেকটা সময় সূর্য প্রখর তাপ বিকিরণ করে এবং যথারীতি এর একটা অংশ বাড়ির অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বাড়ায়। তাই আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা সংরক্ষণে দরকার প্রশস্ত দরজা-জানালা। যেকোনো লিভিং জোনে থাকতে হবে ব্রস-ভেন্টিলেশনের যথাযথ সুব্যবস্থা। অথচ এখনকার আধুনিক বাসাবাড়িগুলোতে বড় বড় জানালা দেয়া হচ্ছে বটে, তবে সেখানে ব্যবহৃত হচ্ছে টানা কাচ; শেডিং ডিভাইসের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। আমরা ভালো করেই জানি, কাচ হিটট্র্যাপিং করে তাপমাত্রা বাড়ায়। সঠিক শেডিং ডিভাইস দেয়া থাকলে এ সমস্যা এড়ানো যায়। উত্তর-দক্ষিণgore_baire_3বরাবর বায়ু চলাচল করে, তাই এই দুই ওরিয়েন্টেশনে জানালা কিংবা যেকোনো ধরনের ওপেনিং বায়ুপ্রবাহকে যথেষ্ট ত্বরান্বিত করে। দক্ষিণে খোলা জানালাগুলোতে এক্সপ্রেসড কাচ থাকা এবং কোনো ধরনের শেডিং ডিভাইস ব্যবহার না করা কোনো অবস্থাতেই উচিত নয়। কেননা আমাদের দেশে সূর্য মূলত দক্ষিণ দিকেই খাড়াভাবে আলো দেয়। তাই থাকতে হবে যথাযথ শেডিং ডিভাইস। পূর্ব-পশ্চিমের জানালাগুলোর জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে কাঠের ল্যুভর, কংক্রিট ল্যুভর কিংবা আরও বিশেষ ধরনের শেডিং ডিভাইস। কাচের জানালাগুলো যথাসম্ভব অপারেবল হতে হবে। কেননা ফিক্সড কাচের জানালায় বায়ুপ্রবাহ একদমই হয় না, বরং হিটট্র্যাপিংয়ের সমস্যা বাড়ে। ছোট ছোট এসব বিষয় লক্ষ রাখলে বাড়ির ভেতরকার আশানুরূপ স্বস্তি-স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করা সম্ভব। এবং অবশ্যই বলতে হবে তুতলী রহমানের বাড়িটিতে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top