স্যাটেলাইটের চেয়ে উঁচু মই অনেক বেশি জরুরি

কোথাও আগুনে একটু বেশি ক্ষয়ক্ষতি হলেই আমরা ফায়ার সার্ভিসকে গালাগাল করি। তারা আসতে দেরি করেছে, তাদের কাছে পানি নেই, তারা আন্তরিক ছিল না ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু অভিযোগগুলো করার সময়ও আমরা জানি, এগুলো সত্য নয়।

খালি দায়টা অন্যের ঘাড়ে চাপানোর বিকৃত আনন্দ পেতেই আমরা ফায়ার সার্ভিসকে গাল দেই। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমার দেখায় ফায়ার সার্ভিস কখনো দেরি করেনি।

খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা রওয়ানা দেয়। তারপর ঢাকার যানজট ঠেলে তাদের ঘটনাস্থলে যেতে হয়। আমরা গালি দেই, কিন্তু ফায়ারসার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্সকেও রাস্তা ছাড়ি না।

বনানীর ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের ঘটনাস্থলে যেতে ১২ মিনিট লেগেছে। ‘উৎসুক জনতা’ রাস্তা আটকে না রাখলে আরো দুয়েক মিনিট আগেই যেতে পারতো। পরে তাদের ২২টি ইউনিট আগুন নেভাতে আসে। মাঠে নামে সশস্ত্রবাহিনীও। হেলিকপ্টার থেকে পানি ছিটানো হয়েছে।

সবার প্রাণান্তকর চেষ্টার পরও ২৫ জন মানুষের জীবন বাঁচানো যায়নি। কিন্তু ফায়ার ফাইটাররা সত্যি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। আন্তরিকতা, সময়ানুবর্তিতা ও ঝুঁকি নেওয়ার সাহস বিবেচনায় বাংলাদেশের ফায়ার ফাইটারদের আমি বিশ্ব সেরা দাবি করি।

দিনের পর দিন গালি খেয়েও একটুও মন খারাপ না করে দায়িত্ব পালন করে যায়। তাদের অভিমান হয় কিনা, মন খারাপ হয় কিনা, জানি না। মানুষের কথা শুনলে তাদের দায়িত্ব পালন করা হতো না।

বনানীতেও মানুষের জীবন বাঁচাতে গিয়ে তিনজন ফায়ার ফাইটার আহত হয়েছেন, একজনের পা ভেঙে গেছে। কিন্তু তাদের কোনো অভিযোগ নেই, কৃতিত্ব দাবি করা নেই, বড়বড় কথা নেই। ফায়ার ফাইটাররাই আসল হিরো, তারা কাজ করে যায় নীরবে।

তবে বাংলাদেশে ফায়ার সার্ভিসের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এনটিভি ভবনে আগুন লাগার পর উঁচু মইয়ের অভাব নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তারপর কেনাও হয়েছে। কিন্তু এখনও বাংলাদেশে সর্বোচ্চ মই ১৪ তলা উঁচু।

এফ আর টাওয়ারের সপ্তম তলায় আগুন না লেগে যদি ২০ তলায় লাগতো; তাহলে তো ফায়ার ফাইটারদেরও উৎসুক জনতার মত চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার থাকতো না। উঁচু মই থাকলে এফ আর টাওয়ার থেকে আরো দ্রুত আরো বেশি মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হতো।

আমরা কথায় কথায় বলি, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। সাবমেরিন, পদ্মা সেতু, স্যাটেলাইট- জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে আমাদের সক্ষমতার বার্তা পৌঁছে দেয় সারাবিশ্বে। কিন্তু সবসময় নিরাপত্তাই প্রথম বিবেচনা। মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই।

বাংলাদেশে এখন ১৪ তলার চেয়ে উঁচু ভবন আছে অনেকগুলো। পূর্বাচলে হচ্ছে আইকনিক টাওয়ার। উঁচু ভবন বানানোর আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ফায়ার সার্ভিসকে আধুনিক ও আরো বেশি সক্ষম করতে হবে। স্যাটেলাইটের চেয়ে উঁচু মই অনেক বেশি জরুরি।

বলছিলাম উৎসুক জনতার কথা। বাংলাদেশে মানুষ বেশি। বাংলাদেশে বাসের টায়ার ফাটলেও কয়েকশ’ মানুষ জমে যায়। আর বনানীর মতো জায়গায় এতো বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তো মানুষ ছুটে আসবেই। এমনিতে বাংলাদেশের মানুষ যে কোনো দুর্ঘটনায় ঝাঁপিয়ে পড়েন।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের আগুনের সময়ও এটা দেখা গেছে। বনানীর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে, একটা ছোট ছেলে সর্বশক্তি দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি পাইপ চেপে ধরে আছে।

আরেকটি ছবিতে দেখা গেছে, অনেকে হাতে হাতে পাইপ এগিয়ে দিচ্ছেন। এটাই বাংলাদেশ। কিন্তু অতি উৎসাহী জনতা কখনো কখনো উদ্ধারকাজে বিঘ্ন ঘটায়। বনানীতে তাই হয়েছে। উৎসুকজনতা রাস্তা আটকে ফেলায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স ঠিকমতো চলতে পারেনি।

অনেকেই স্রেফ দর্শক হিসেবে এসেছিলেন,মোবাইলে ছবি তুলেছেন, ফেসবুকে লাইভ করেছেন। এ ধরনের জনতাকে নিয়েই বিপদ। বনানীর ঘটনায়, ফায়ার সার্ভিস এবং পুলিশ চেষ্টা করেও পারেনি। শেষ পর্যন্ত উৎসুক জনতাকে সরাতে সেনাবাহিনী নামাতে হয়েছে।

আমরা আরেকজনের কাজের ভুল ধরতে, সমালোচনা করতে, দায়টা আরেকজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে ওস্তাদ। কিন্তু নিজের কাজটা ঠিকমতো করি না। বনানীর রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আমরা ফায়ার সার্ভিসের সমালোচনা করি। আমরা যেন বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াই। কারো বিপদের কারণ যেন না হই।

লেখকঃ প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top