‘আমার মতো হাজারো মা এই যুদ্ধে শামিল’

অনেক দিন—হ্যাঁ, অনেক দিনই তো। এক যুগেরও কিছু বেশি সময়। যুদ্ধ করছি। যার নামও জানতাম না, যা চিনতাম না, সেই তারই সঙ্গে যুদ্ধ। এখন সেই আমার অনেক চেনা, অনেক জানা, আপনও বলা যেতে পারে। তার নাম অটিজম।

১৫ বছর আগের কথা। আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের, সবচেয়ে খুশির দিনটি এল। আমি মা হলাম। কেমন সেই অনুভূতি—তা বলে বোঝানোর মতো নয়। চোখে শুধু স্বপ্ন। কবে আমার ছেলে বসবে, কবে হাঁটবে, কবে ‘মা’ বলে ডাকবে। স্বপ্নে বিভোর আমি। ওর যখন দুই বছর পাঁচ মাস বয়স তখন আমার কোলজুড়ে এল আমার দ্বিতীয় সন্তান। কিন্তু তখনো পর্যন্ত আমি ‘মা’ ডাক শুনতে পেলাম না।

আমার সব স্বপ্ন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এল। ওর যখন তিন বছর বয়স, তখন জানতে পারলাম আমার সোনামণি অটিজমে আক্রান্ত। ওই যে শুরুতে বলেছিলাম যুদ্ধ। অটিজমের সঙ্গে যুদ্ধ। যুদ্ধ নয় তো কী বলব তাকে? শুধু আমি কেন, আমার মতো হাজারো মা এই যুদ্ধে শামিল। যাঁদের সন্তান অটিজমে আক্রান্ত, শুধু তাঁরাই জানেন এই যুদ্ধ কত ভয়াবহ। কারণ, এই যুদ্ধে শামিল হয়ে আমাদের যে এই সমাজের সঙ্গেও যুদ্ধ করতে হচ্ছে।
ছেলেকে নিয়ে যখন বাইরে বের হন তখন ছেলে ছাড়া আর মাথায় কিছু থাকে না মা সুলতানা সেলিনার।
অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা আর দশটা স্বাভাবিক শিশুর মতো না। তাদের অনেক সীমাবদ্ধতা থাকে। তাদের আচরণে অনেক সমস্যা থাকে, যা সমাজের অনেকের কাছে অনেক সময় গ্রহণযোগ্য হয় না। সেটা তাঁদের ( সাধারণ মানুষ) কোনো দোষের মধ্যে পড়ে না আমি বলব। কারণ, তাঁরা অনেকেই এই ব্যাপারে (অটিজম) তেমন কিছু হয়তো জানেন না। যখন তাঁদের আমাদের সন্তানদের ব্যাপারে বলা হয়। তখন অনেকের সহানুভূতি আমরা পাই। রাস্তায় যখন আমার ছেলে ইয়াহিয়া খান রাকিন কোনো অস্বাভাবিক আচরণ করে, অনেকে তাকিয়ে থাকে। ১৫ বছরের একটি ছেলে যদি তার মাকে রাস্তায় টানতে থাকে, সবাই অবাক হয়ে তাকাবে—এটাই তো স্বাভাবিক। অনেকে না বুঝে ওকে ধমকও দেয় যে কেন সে আমাকে টানছে, চিৎকার করছে। কী করব? এটাই যে আমাদের মতো মায়েদের নিয়তি (নাকি পুরস্কার)। রাকিন অটিজমে আক্রান্ত জানার পর আমি চাকরি ছেড়ে দিই। রাকিন কম্পিউটারে বিভিন্ন কাজ করতে ভালোবাসে, বিশেষ করে গান শুনতে ও ছবি দেখতে পছন্দ করে।

ওকে (ছেলেকে) নিয়ে যখন বের হই, পৃথিবীর কোথায় কী হচ্ছে, আমার সামনে দিয়ে কে যাচ্ছে, কী যাচ্ছে, আমার মাথায় কিছু থাকে না, শুধু ও ছাড়া। এমন অনেক দিন গেছে, রাকিন আমার হাত থেকে ছুটে রাস্তার মাঝখানে চলে গিয়েছে, আমি দিশেহারা হয়ে দৌড়ে গেছি ওকে নিরাপদে নিয়ে আসতে। টানাটানি করে যখন পারছিলাম না, তখন আমার পাশে সাহায্যের জন্য দাঁড়িয়েছেন কেউ। কৃতজ্ঞতায় মন ছুঁয়ে গেছে। মুখে কিছু বলতে পারিনি। রাকিন পাশে থাকলে, ওকে আগলে রাখার চিন্তায় আমার কথাগুলোও হারিয়ে যায়। কত বদলে গেছি আমি! কত বদলে গেছি আমরা—এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের মায়েরা!

লেখক: সুলতানা সেলিনা।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top