প্রধানমন্ত্রীকে আপা ডাকা যায়, অথচ সরকারি কর্মচারীকে ‘দিদি’ ডেকে লাথি খেতে হয়!

একজন বিসিএস ক্যাডার প্রসাশন কর্মকর্তা নারীকে এক মাছ ব্যবসায়ী আন্তরিকভাবে ‘দিদি’ বলে ডেকেছেন। সেই ক্যাডার এতে ক্ষীপ্ত হন, মাছ ব্যবসায়ীর মাছের থালায় লাত্থি দেন। সাথে ইংরেজিতে গালি দেন। সভ্য দেশ হলে প্রজাতন্ত্রের এই কর্মচারীর জবাবদিহিতা করা লাগত এবং হয়ত জরিমানাও দিতে হতো। এই ভদ্রমহিলা ফেঞ্চুগঞ্জের এসি ল্যান্ড। তার নাম সঞ্চিতা কর্মকার।

ভুক্তভোগী মাছ ব্যবসায়ী লায়েক আহমেদের জবানিতে ঘটনাটা শুনা যাক। তিনি বর্ণনা করেন কি হয়েছিল সেখানে- “পূর্ব বাজার ডাক বাংলোর সামনে বাজার বসানোর নিয়ম না থাকলেও ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই সকালে সেখানে মাছ বিক্রি করে আসছিলেন। ওইদিন সকাল ১০টার দিকে এসিল্যান্ড ডাক বাংলোর সামনে এসে মাছের বাজার সরাতে বলেন। সেসময় তাকে বলি যে- ‘সরাচ্ছি দিদি।’ এরপর তিনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘দিদি বললি কেন?’ তিনি ইংরেজিতে গালি দেন এবং মাছের ঝুড়িতে লাথি দিলে ঝুড়িটি পাশের ড্রেনে পড়ে যায়।”

বেচারা মাছ ব্যবসায়ী হয়ত শিক্ষিত ক্ষমতাধর বিসিএস ক্যাডার ভদ্রমহিলার ইংরেজির গালি বুঝতে পারেননি। কিন্তু, তিনি হয়ত স্তব্ধ হয়ে ভাবছিলেন দিদি ডাকা কি এত বড় অপরাধ? ব্রেকিং ব্যাড সিরিজে দেখেছি, একজন এজেন্ট ওয়ারেন্ট ছাড়া আসামীকে মারধোর করায় তার চাকরি চলে যায়। অথচ, বাংলাদেশে একজন সরকারি কর্মচারি, আইনের লোককে ভাই বলতে গেলেও ভয় লাগে, এই বুঝি তিনি মাইন্ড করে বসেন। আমার নিজের এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। তিন বন্ধু রিকশায় যাচ্ছি। কমলাপুরের দিকে পুলিশ রিকশা থামালো। আমার এক বন্ধুকে সেই পুলিশকে স্যার বলে ডাকলো। আমি ডাকলাম ভাই বলে। তিনি একটু রাগতস্বরে বললেন, আমি তোর কিসের ভাই লাগি?” আমি কিছু বলতে পারলাম না, হতভম্ব হয়ে গেলাম।

অথচ, আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীকে যে কেউ আপা বলে ডাকতে পারে। তিনি তাতে মাইন্ড করেন বলে তো কখনো শুনিনি। শেখ হাসিনাকে অনেকের পছন্দ হবে, কেউ কেউ তার সমর্থক হয়ত হবেন না। কিন্তু, ঘোরতর বিরোধীরাও হয়ত ঈর্ষা করবেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকভাবে সবাই কাছে টানার ব্যাপারটি দেখে। বঙ্গবন্ধুকেও মুজিব ভাই বললে তিনি খুশি হতেন। অথচ এই বাংলাদেশের রাষ্ট্রের কর্মচারীদের স্যার / ম্যাম না ডাকলে তারা এমন ব্যবহার করেন! সবাই হয়ত এমন করেন না, স্যার ডাক সবাই আশাও করেন না হয়ত। তবুও, কারো কারো আচরণে মনে হয়, তারা চাকরি করছেন না, জমিদারি নিয়ে বসেছেন। ভুলে গেলে চলবে না সরকারি কর্মচারীরা যে বেতন পান, সেই অর্থ আকাশ থেকে আসে না। প্রত্যেকটা সাধারণ মানুষের কষ্টের, পরিশ্রমের টাকা এই সরকারি কর্মচারীদের বেতনের জোগানে ভূমিকা রাখে।

আচ্ছা, সরকারি চাকরির ভাইভার সময় তারা কি বলে থাকেন? জনগণের মহান কল্যাণের জন্য তারা কাজ করবেন, জনগণের সেবা করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু, কর্মক্ষেত্রে আসলে তাদের আচরণ কি কিছুটা বদলে যায় না? তারা কি নিজেদের ক্ষমতাধর ভাবতে শুরু করেন না? ক্ষমতা থাকলেই বা কেন সেটার অপব্যবহার করতেই হবে?

কিছুদিন আগে কানাডার অটোয়ায় বন্যা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি যাওয়ায় সেখানে ভীড় জমে বলে ভলান্টিয়াররা কাজ করতে পারছিলেন না ঠিকমতো। প্রধানমন্ত্রীকে সেখানে এক বৃদ্ধ রাগতস্বরে বলেন, আপনি কি জানেন কতক্ষণ ধরে আপনি মানুষজনকে আটকে রেখেছেন? আমি আধা ঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি বালুর বস্তা নেওয়ার জন্য!

পেছন থেকে একজন বৃদ্ধকে শান্ত হতে বললে, বৃদ্ধ শুনিয়ে দেন এটা একটা ফ্রি কান্ট্রি। আর সে ( জাস্টিন ট্রুডো) আমাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। অবশ্য, ট্রুডো সাথে সাথে ভদ্রলোকের মতো কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে চলে আসেন। বাংলাদেশে এই কথা কেউ মুখের উপর দূরে থাক, ফেসবুকে বললেও হয়ত ডিজিটাল আইনে মামলা হয়ে যেত। হয়ত ৬৪ জেলায় ৬৪০ টি মানহানির মামলা খেয়ে বসে থাকতে হতো সেই বৃদ্ধকে।

আমি শুধু ভাবি, এই দেশে আমি কখনো কোনো ক্ষমতাধর নেতা কিংবা ক্ষমতাধর চাকরিজীবিকে কোনো অনৈতিক আচরণের প্রেক্ষিতে মুখের উপরে বলতে পারব, এটা একটা ফ্রি কান্ট্রি, স্বাধীন দেশ! এটা কখনো জোরগলায় বলতে পারব না। যেদেশে সরকারি কর্মচারীকে পর্যন্ত স্যার বলে না ডাকাটা বেয়াদবি সেখানে এমন কিছু বললে ফাঁসিও হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

মাঝে মধ্যে একারণেই মনে হয়, ক্ষমতাহীনতা এদেশে মূলত বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা…

কমেন্টসমুহ
BD Life BD Life

Top