মাজেদের গ্রেপ্তার অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে

বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের স্বঘোষিত খুনি ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বরখাস্তকৃত ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ পুলিশের হাতে গত ৭ এপ্রিল ঢাকায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। মাজেদকে কোত্থেকে আটক করা হয়েছে, তা নিয়ে সংবাদটি পরস্পরবিরোধী। একটি সংবাদে বলা হয়েছে, তাঁকে খুব ভোরে গাবতলী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আর অন্য সংবাদে বলা হচ্ছে, মাজেদ মিরপুর থেকে আটক হয়েছেন। তাঁকে যদি গাবতলী থেকে আটক করা হয়, তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় এত ভোরে মাজেদ ওই স্থানে কী করছিলেন। সত্য যা-ই হোক, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার ৪৫ বছর পর মাজেদকে গ্রেপ্তার করা হলো। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে হত্যা মামলার আসামি হিসেবে মাজেদকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁর প্রাণভিক্ষার আরজি নাকচ হয়ে গেছে, ২১ দিনের মধ্যে তাঁর দণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়ার কথা। অন্যান্য ঘাতকের চেয়ে মাজেদের নৃশংসতার মাত্রা ছিল অনেক বেশি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে হত্যাযজ্ঞ চলছিল তখন বঙ্গবন্ধুর আদরের সন্তান ৯ বছরের শেখ রাসেল ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মাজেদের কাছে পানি খেতে চেয়েছিল। যেতে চেয়েছিল মায়ের কাছে। মাজেদ তাকে ভেতরে নিয়ে মাথায় গুলি করে হত্যা করেন। একজন মানুষ কতটুকু নৃশংস হলে এমন একটি ভয়াবহ কাজ করতে পারে তা চিন্তা করলেও গা হিম হয়ে যায়। এরপর মাজেদ বঙ্গভবনেও বেশ কয়েক দিন বিচরণ করেন। এরই মধ্যে তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদের পিএসকে বস্তায় ভরে বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে হত্যা করেন। ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ডেও মাজেদ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মাজেদ দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতে অবস্থান করছিলেন। তবে এই খবরের সত্যতা যাচাই করা যায়নি। যদিও দেশ বর্তমান সময়ে করোনাজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবে একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, তথাপি মাজেদের গ্রেপ্তার একটি স্বস্তিদায়ক খবর। তবে তাঁর গ্রেপ্তার অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। ঢাকা আর দিল্লিতে যে সরকারই থাকুক, দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের তেমন একটা হেরফের হয়নি। মাঝেমধ্যে হয়তো কিছুটা শীতল হয়েছে, বিশেষ করে খালেদা জিয়ার শাসনকালে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এত দীর্ঘ সময় ধরে মাজেদের মতো একজন ঘাতক কিভাবে ভারতে লুকিয়ে ছিলেন? শোনা যাচ্ছে, আরেক মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ঘাতক মোসলেহউদ্দিনও ভারতে পালিয়ে আছেন। মাজেদকে আটকের পর সংবাদ রটেছিল যে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিলেন। এমন তত্ত্ব বিশ্বাসযোগ্য নয় এ কারণেই যে বাংলাদেশ তো এই ব্যাধিমুক্ত নয়, বরং বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভারতের চেয়ে এখন আরো খারাপ হয়ে উঠছে। তাঁর পক্ষে অনেক যৌক্তিক ছিল নেপাল বা ভুটানে যাওয়া, জেনেশুনে মৃত্যুদণ্ড আলিঙ্গন করতে বাংলাদেশে না আসা।

প্রশ্ন আরো আছে। মাজেদ ঢাকায় কিভাবে এলেন? তাঁর কি কোনো পাসপোর্ট বা ভ্রমণ দলিল ছিল? তা যদি হয়, তাহলে এসব জোগাড় হলো কিভাবে? ইমিগ্রেশনের কাউন্টার কিভাবে পার হলেন? পাঠকদের আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? একটি বেসরকারি টিভিতে তিনি নিয়মিত মানুষকে ইসলামের হেদায়াত করতেন। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরই মধ্যে বাচ্চু রাজাকার নিরাপদে দেশ ছেড়ে চলে যান। বাচ্চু রাজাকার গেলেন আর মাজেদ দেশে ফিরলেন! তাঁরা বিমানবন্দর বা সীমান্ত চেকপোস্ট ব্যবহার করে থাকলে প্রশ্ন উঠতেই পারে সরকারের ভেতরে এমন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কি আছে, যিনি বা যারা তাঁদের এসব ব্যাপারে সহায়তা করে? তেমন যদি হয়, তাহলে তা দুশ্চিন্তার কথা। আর তাঁরা যদি বৈধ কাগজপত্র ছাড়া সীমান্ত অতিক্রম করেন, তাহলে প্রশ্ন উঠবে আমাদের সীমান্ত প্রহরীরা কী করছিলেন?

বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত ঘাতক আবদুল মাজেদের বাংলাদেশে প্রবেশ নিশ্চিতভাবে চিন্তার বিষয়। মাজেদকে কি অন্য কেউ বদমতলবে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছিল, নাকি তিনি নিজেই কোনো বদমতলবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন? তাঁর বা তাঁদের কি কোনো বিশেষ মিশন ছিল বা আছে?

নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুপরোয়ানা জারি হওয়ার ২১ দিনের মধ্যে মাজেদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়ার কথা। হয়ে গেলে হয়তো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অজানা তথ্যও তার সঙ্গে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। সুতরাং দণ্ডাদেশ কার্যকর করার আগে তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে—যেমনটি দাবি করেছেন ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর ছেলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। ফারুক, রশিদ, ডালিম, হুদা, নূর চৌধুরী, শাহরিয়ার, মাজেদ, মহিউদ্দিন, মোসলেহউদ্দিনসহ আরো বেশ কিছু সেনা সদস্য ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁদের সহায়তা করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহচর খন্দকার মোশতাক, সেনাবাহিনীর উপপ্রধান জেনারেল জিয়া, বঙ্গবন্ধু সরকারের জাঁদরেল আমলা মাহবুব আলম চাষিসহ আরো কয়েকজন। জিয়াকে বঙ্গবন্ধু নিজের পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। তাঁর জন্য তিনি সেনাবাহিনীতে উপপ্রধান পদটি সৃষ্টি করেন। খালেদা জিয়াকে তিনি বলতেন তাঁর আরেক কন্যা। ঘাতক রশিদ মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু সরকারকে উত্খাত করার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জিয়াকে অবহিত করেন। জিয়া তাঁদের সবুজ সংকেত দেন। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে জিয়ার উচিত ছিল এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবহিত করা। তিনি তা করেননি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি লাভবান হন জিয়া। তিনি বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, সেনাপ্রধান এবং পরে রাষ্ট্রপতি হন, যা বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তিনি চিন্তাও করতে পারতেন না।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ৮৬ দিনের মাথায় ৭ নভেম্বর জিয়া তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। জিয়া সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণের (যদিও তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সায়েমকে সাক্ষীগোপাল রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিলেন) পর বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বাংলাদেশ ত্যাগ করে ব্যাংকক হয়ে লিবিয়া চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এসব কাজে তাঁকে সহায়তা করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্কালীন কর্মকর্তা সমশের মবিন চৌধুরী। সমশের মবিন চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে আহত হলে তাঁকে বঙ্গবন্ধু পূর্ব জার্মানিতে পাঠিয়ে চিকিৎসা করিয়ে এনে পঁচাত্তরের জানুয়ারি মাসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করেন। খালেদা জিয়ার আমলে তিনি পররাষ্ট্রসচিব পর্যন্ত হয়েছিলেন। এখন তিনি খালেদা জিয়া বা বিএনপির সংস্রব ত্যাগ করেছেন। পরে জিয়া এই ঘাতকদের বিভিন্ন দূতাবাসে উচ্চপদে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃৃত করেন। আবদুল মাজেদকে সেনেগাল দূতাবাসে পদায়ন করা হয়। পরে ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ তাঁকে বিআইডাব্লিউটিসিতে উচ্চ পদে পদায়ন করা হয়। এরপর তাঁকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে তখনকার যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের ‘ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট’ শাখার পরিচালক ও জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তরের পরিচালক করা হয়। জিয়ার মৃত্যুর পর এরশাদের আমলে আরেক ঘাতক ফারুক রহমান দেশে ফিরে আসেন। ফারুক পঁচাত্তরের ঘাতকদের নিয়ে বাংলাদেশ ফ্রিডম পার্টি নামের একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন এবং এরশাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রহসনমূলক সংসদ নির্বাচনে বেগম জিয়ার বদৌলতে আরেক ঘাতক আবদুর রশিদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য হন। ধারণা করা হচ্ছে, আবদুর রশিদ বর্তমানে পাকিস্তানে পলাতক আছেন। এক-এগারোর পর বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল আবদুর রশিদের একটি সাক্ষাত্কার প্রচার করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে রশিদ ও মাজেদ বাংলাদেশ ত্যাগ করেন বলে ধারণা করা হয়।

দেশের বাইরে থাকায় ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিভীষিকা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বাংলাদেশের আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ছয় বছর নির্বাসিত জীবন শেষ করে শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফেরেন। তাঁর দেশে ফেরার পর থেকেই তিনি একাধিকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, বর্তমানে লন্ডনে পলাতক তারেক রহমান শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশে জঙ্গিদের দিয়ে ভয়াবহ গ্রেনেড আক্রমণ চালান। ভাগ্যক্রমে দলীয় নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে তিনি সেই যাত্রায় বেঁচে যান। এতে প্রায় শখানেক দলীয় নেতাকর্মী নিহত হন। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি বর্তমানে অনেকটা বিলুপ্তির পথে। তবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়ে গেছে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। সে কারণেই মাজেদের বাংলাদেশে প্রবেশ ও গ্রেপ্তার অনেকেই সহজভাবে নিতে পারছে না। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা খুবই জরুরি। জানা দরকার ১৯৭৫ সালের দেশ কাঁপানো অনেক ঘটনার না জানা সব কথা, কাদের সহায়তায় তিনি বাংলাদেশে এসেছেন, তাঁর প্রকৃত মিশন কী ছিল। তবে এর মধ্যে যদি মাজেদের ফাঁসি কার্যকর হয়ে যায়, হয়তো পঁচাত্তরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অজানাই থেকে যাবে। ভারতে করোনাভাইরাসের প্রকোপ থেকে বাঁচতে মাজেদ বাংলাদেশে এসেছেন, তা কেউ তেমন একটা বিশ্বাস করছে না।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top