নামাজে দেখে কোরআন তিলাওয়াত : ইসলাম কী বলে?

রাসুল (সা.)-এর যুগ থেকে কোরআন সংরক্ষণের জন্য সূচনালগ্ন থেকে দুটি ধারা চলে আসছে। মুখস্থকরণ ও লিপিবদ্ধকরণ। এর মধ্যে মুখস্থকরণ এমন এক অভিনব ও সুচারু মাধ্যম, যার দৃষ্টান্ত পূর্ববর্তী কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে ছিল না। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছরের পরও কোরআন অবিকল অবস্থায় আমাদের কাছে পৌঁছার জন্য এই মুখস্থকরণ রীতিই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। এ জন্যই কাজী ফয়সাল ইবন আয়াজ (রহ.) ‘আত-তিবইয়ান’ গ্রন্থে বলেন, ‘ইসলামে ইলমের মূল বাহক হচ্ছেন হাফেজে কোরআনরা।’ (আত-তিবইয়ান : ৫৫)। এ থেকেও অনুমিত হয় কোরআন মুখস্থকরণের গুরুত্ব কতটা তাৎপর্যের দাবি রাখে। এখানে বিবেচ্য বিষয় শুধু তারাবিতে কোরআন দেখে দেখে পড়া বৈধ, নাকি অবৈধ সেটি নয়। কারণ এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে উম্মতে মুসলিমাহর বক্ষে কোরআন ধারণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তায় ব্যত্যয় ঘটা, না ঘটার বিষয়টিও। কিছু আরব্য জনগোষ্ঠীর সৃষ্ট এই নবধারার তারাবি উম্মতের শিশু-কিশোরদের মধ্যে কোরআন মুখস্থকরণ ও করানোর যে গভীর আগ্রহ রয়েছে, তাতে অনীহার সৃষ্টি করবে। সেই সঙ্গে এরই মধ্যে যারা হিফজ সম্পন্ন করেছে তাদের মধ্যে এখনো চালু থাকা রমজানকেন্দ্রিক অন্তরে ধারণকৃত কোরআনকে ঝালিয়ে নেওয়ার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অনীহা সৃষ্টি করবে; যার পরিণামে একসময় কোরআন মুসলমানের অন্তর থেকে বিদূরিত হয়ে তা শুধু গ্রন্থে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। (নাউজুবিল্লাহ)

নামাজে দেখে কোরআন পড়ার বিরুদ্ধে কোরআন-হাদিসের দলিল আছে। কোরআনুল কারিমের সুরা বাকারার ১৪৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘অতএব, আপনি মসজিদুল হারামের দিকে চেহারা ফিরান’ আর আমরা সাধারণত দেখি যে নামাজে দেখে কোরআন পাঠ করার সময় তা পাশে রাখা হয় এবং ফাতেহা শেষ করে ইমাম সাহেব পাশে রাখা কোরআনের প্রতি ফেরেন ও দেখে দেখে পাঠ করেন। এ ক্ষেত্রে তার মুখ কিবলার দিকে থাকে না। আর নামাজের দিকে মনোযোগও থাকে না, বরং সব মনোযোগ কোরআনের হরফ আর পৃষ্ঠায় মগ্ন থাকে, যা নামাজের আদবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। শাইখ ইবন বায (রহ.) ‘হেদয়াতুল হায়েরীন সিফাতু সালাতিন্নাবিয়্যি’ গ্রন্থের ২৯৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘নামাজি যেখানে যেই অবস্থায়ই হোক তার প্রতিটি অঙ্গ নিয়ে কিবলামুখী হওয়া আবশ্যক।’

রাসুল (সা.) বলেন, ‘নামাজে আমার পাশে আহলে ইলম ও বুঝমান লোকেরা দাঁড়াবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৪৩২)। এই হাদিসের মর্ম হচ্ছে, যদি কোনো কারণে কোনো সংকট দেখা দেয়, তাহলে যেন সেই আহলে ইলমরা নামাজের হাল ধরতে পারেন বা সংশোধন আনতে পারেন। কাজেই যদি নামাজে দেখে দেখে কোরআন পাঠ করার অনুমতি হতো, তাহলে এই হাদিসের কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকত না।

রাসুল (সা.) আরো বলেন, ‘যখন তোমরা নামাজ আদায় করবে তখন দৃষ্টি এদিক-সেদিক ঘোরাবে না। কেননা আল্লাহ তাআলা নিজ চেহারা বান্দার ওপর ততক্ষণ রাখেন যতক্ষণ সে তার দৃষ্টি না ফেরায়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৮৪৩, মুসতাদরাকে হাকিম হাদিস : ৮৪৩)। অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা সেভাবেই নামাজ আদায় করো যেভাবে আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখো।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৩১)।

আর নবীজীবনের ২৩ বছরের ইতিহাসে কোথাও এ কথার প্রমাণ নেই যে তিনি বা তাঁর কোনো সাহাবি তাঁর জীবদ্দশায় নামাজে দেখে কোরআন পাঠ করেছেন। বরং উমার (রা.) থেকে এ ব্যাপারে পরিষ্কারভাবে নিষিদ্ধের বর্ণনা রয়েছে। ‘আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, উমার (রা.) আমাদের নাবালেগের ইমামতি ও ইমামের দেখে কোরআন পাঠ করা থেকে নিষেধ করেছেন।’ (কিতাবুল মাসাহিফ, পৃষ্ঠা ১৮৯)

ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.) তাঁর ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, নামাজি ব্যক্তি যখন দাঁড়ানো অবস্থায় থাকে তখন তার জন্য আবশ্যক হলো সে তার দৃষ্টি সিজদার জায়গায় রাখবে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এই মতটি সমর্থন করেছেন। (মুয়াত্তা মুহাম্মাদ, হাদিস : ২৯১)

সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব সূত্রে কাতাদাহ (রহ.) বলেন, তিনি বলেছেন ‘রাত্রি জাগরণের সালাতে মুসল্লির যদি সামান্য কিছুও মুখস্থ থাকে, তাহলে সে তা-ই বারবার পড়তে থাকবে। কিন্তু নামাজে দেখে কোরআন পড়বে না।’ বিখ্যাত মুফাসসির মুজাহিদ (রহ.) বলেন, ‘নামাজে দেখে দেখে কোরআন তিলাওয়াত করা মাকরুহ। কারণ এর দ্বারা আহলে কিতাবদের সঙ্গে সাদৃশ্য হয়ে যায়।’ (কিতাবুল মাসাহিফ : ১৮৯-১৯০)

পাঠকবৃন্দ! উপরোক্ত আয়াত ও হাদিসগুলো হূদয়ঙ্গম করার পর ভাবুন, নামাজে মনোনিবেশ ও একাগ্রতার আদেশের কথা সর্বজনবিদিত বিষয়। আর কোরআন দেখে পড়ার বেলায়; কোরআন ধরা, পাতা ওল্টানো ও দেখে পঠনকার্যের ক্ষেত্রে নামাজের একাগ্রতা মোটেও থাকার সুযোগ নেই। অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ঘরে এমন কোনো বস্তু থাকা উচিত নয়, যা নামাজির মনোযোগ সেদিকে ধাবিত করে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২০৩০)

তাই আমাদের উচিত নামাজে একাগ্রতা নষ্ট হয় এমন সব কাজ পরিহার করা। নামাজে কোরআন দেখে পড়াও তেমনই একটি কাজ, যা বহু ইসলামী আইনবিদ মাকরুহ ফতোয়া দিয়েছেন।

লেখক : অনুবাদক ও মুহাদ্দিস

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top