করোনার মধ্যেই চার জেলায় ডায়রিয়ার প্রকোপ

করোনার মধ্যেই এখন আবার নতুন করে ডায়রিয়ার রোগের প্রাদুর্ভাব। গত কয়েক দিনে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক থেকে শুরু করে নার্সরাও। আবহাওয়া তপ্ত হয়ে ওঠায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা।

পিরোজপুর সিভিল সার্জন ডা. মো. হাসনাত ইউসুফ জাকি জানান, বৃষ্টি না হওয়ায় এবং অত্যধিক গরমের কারণে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বেশ কিছু জেলায় উপজেলায়।

চার জেলা থেকে প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য মতে খবর:

পটুয়াখালী: পটুয়াখালীতে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় ৩২১ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সরকারি হিসাবে ডায়রিয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় বাউফল ও পটুয়াখালী সদর উপজেলায় একজন করে মারা গেছেন। তবে, স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্যে এ পর্যন্ত অন্তত ১৫ জন মারা গেছেন। তাদের সবাই নিজ নিজ বাড়িতেই মারা গেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এদিকে ডায়রিয়ার স্যালাইনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে জেলায়। হাসপাতাল কিংবা স্থানীয় ফার্মেসিতে স্যালাইন মিলছে না। আবার স্যালাইন পাওয়া গেলেও দাম আকাশচুম্বী। এমনিতেই সারাদেশে চলছে করোনার মহামারির সর্বাত্মক লকডাউন তার ওপর ডায়রিয়ার প্রকোপে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করছেন ভুক্তভোগীরা।

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জানুয়ারি থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত সাত হাজার ৩৪১ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুই হাজার ২২৩ জন, মির্জাগঞ্জ হাসপাতালে ৯৮১ জন, বাউফলে ৯২০ জন, সদরে ৭৮০ জন, দশমিনায় ৬৯১ জন, কলাপাড়ায় ৬৮৩ জন, গলাচিপায় ৬৬৩ জন ও দুমকীতে ৪০০ জন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

এ ব্যাপারে পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম শিপন জানান, সম্প্রতি ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দিয়েছে এবং এ পর্যন্ত সাত হাজার ৩৪১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। জেলার প্রতিটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত স্যালাইন ও ওষুধ মজুদ রয়েছে। এ পর্যন্ত বাউফল ও সদর উপজেলায় দু’জন মারা গেছেন।

পিরোজপুর: পিরোজপুরে ক্রমাগত ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। এদিকে জেলার হাসপাতালগুলোতে আইভি স্যালাইনের সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ১২৪ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী ভর্তি রয়েছে বলে সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে ভান্ডারিয়া উপজেলায় ৩০ জন, মঠবাড়িয়ায় ৩৪ জন, নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) ২৪ জন, কাউখালীতে ১৮ জন, নাজিরপুরে ৭ জন এবং জেলা হাসপাতালে ১১ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকেও প্রতিদিন প্রচুরসংখ্যক রোগী পরামর্শ ও চিকিৎসা নিচ্ছেন।

পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলায় হাসপাতালের সক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি রোগী আসায় চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।

ভান্ডারিয়া উপজেলা হাসপাতালে বারান্দায়ও রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিতে দেখা গেছে। কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডায়রিয়া ওয়ার্ডকে করোনা ওয়ার্ড করায় এখন সাধারণ, নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডে অন্য রোগীদের সঙ্গে ডায়রিয়া রোগীদের ভর্তি করা হচ্ছে।

কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, অতীতের যে কোনো বছরের তুলনায় এবার ডায়রিয়ায় আক্রান্তের হার বেশি।

পিরোজপুর সিভিল সার্জন ডা. মো. হাসনাত ইউসুফ জাকি জানান, হঠাৎ ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে কিছুটা আইভি স্যালাইনের সংকট দেখা দিয়েছে।

চরফ্যাসন (ভোলা): চরফ্যাসনে গত এক সপ্তাহে শিশু, নারী ও পুরুষ মিলে চরফ্যাসন সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন পাঁচ শতাধিক রোগী। শয্যা সংকটের কারণে হাসপাতালের মেঝে এবং বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ১৫টি বেড থাকলেও গত রোব থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হঠাৎ করেই ডায়রিয়া রোগী বেড়ে যাওয়ায় শয্যার অভাবে হাসপাতালের মেঝে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

চরফ্যাসন হাসপাতালের টিএইচও ডা. শোভন বসাক জানান, সিজনের কারণে মূলত এই সমস্যা হচ্ছে। এ ছাড়া মানুষের অসচেতনতাও ডায়রিয়ার কারণ।

শৈলকূপা (ঝিনাইদহ): প্রচণ্ড তাপদাহে ঝিনাইদহের শৈলকূপায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে শিশু ডায়রিয়ার রোগী। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশু ও রোগীর স্বজনদের চাপে বেড ও মেঝেতে তিলধারণের ঠাঁই নেই। নেই কোনো সামাজিক দূরত্বও। গরমে ডায়রিয়াবাহিত রোটা ভাইরাস বিস্তার লাভ করায় শিশুরা এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে আবাসিক মেডিকেল অফিসার জানান।

মঙ্গলবার সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা যায়, শিশু, পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ডের অধিকাংশ বেডে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশু। বেড না পেয়ে আবার মেঝেতে ঠাঁই নিয়েছেন অনেকেই।

কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার আতিকুজ্জামান বলেন, মঙ্গলবার সকাল থেকে দুই ঘণ্টায় তিনি ১২ শিশু রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছেন। গত এক সপ্তাহে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত কয়েকশ শিশু জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে।

আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. একেএম সুজায়েত হোসেন জানান, গরমে ডায়রিয়াবাহিত রোটা ভাইরাস বিস্তার লাভ করে। ফলে এ সময় শিশুরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয় বেশি। অত্যধিক গরমে শিশুদের ঘর থেকে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top