একটি অসঙ্গায়িত বন্ধুত্বের কবলে আমি এবং আমার ক্যারিয়ার, মুক্তির উপায় কী?

প্রশ্নটি আমাদের ফেসবুক পেজে করেছেন : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন তরুণ

ক্লাস এইটে প্রথম একটা মেয়কে দেখে ভালো লাগে। ২০০৮ এর ২১শে ফেব্রুয়ারি, শহীদমিনারে ফুল দিতে এসেছিল। আমিও গিয়েছিলাম বন্ধুবান্ধব সহ,প্রাতঃ র্যালি সেরে আশেপাশে উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির সময় চোখে পড়ে। পরবর্তী ৩ বছর ওখানে পড়াশুনা করলেও কোনদিন সাহস করে মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা ভুলেও করিনি। পরিবারসহ ওখানে ভাড়াবাসা নিয়ে থাকতাম কি না, আর ওরা ছিল লোকাল। পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই ভীরু প্রকৃতির, এতোটা সাহস বুকে আনার জো ছিল না। কলেজ ঢাকায়,বয়েজ কলেজ তাই কোন বান্ধবীর সহচার্যে যাবার সুযোগ ছিল না। সমস্যার ভিত্তিপ্রস্তর মূলত এখানেই রচিত হয়। আমার কল্পনার জগতে মেয়ে বিষয়টা ক্রমশ বার্মুডা ট্রাইএংগেলের মতো গভীর রহস্যময় রূপে ধরা দিতে থাকে। তাই তাদের নিয়ে আগ্রহের কমতি ছিল না।

আরেকটা ব্যাপারের বেশ কার্যকারিতা ছিল এখানে,”ভলো একটা বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তি হতে পারলে আমার এই দুর্দশার পরিত্রাণ ঘটবে,সারারাত কথা বলার জন্য ফোনের ওপাশে কাওকে পাব আমি,পাশাপাশি বসে সিনেমা দেখা আমাকে দিয়েও হবে,এই অগছালো জীবনের খবরদারির জন্য কেউ থাকবে যে কিছুক্ষণ পরপর ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করবে সময়মত খেয়েছি কি না কিংবা গোসলের পরে চুল ঠিক করে আঁচরেছি কি না, আর কতো কি!” গ্রামের বাড়িতে আমাদের ঘর থেকে অনতিদূরে একটি ঘর আছে,যেখানে ছোট্ট একটি পরিবার বাস করে। সেই পরিবারের অন্যতম সদস্য একটি মেয়ে,ধরে নিলাম তার নাম নিধি।এডমিশন টেষ্ট এর পরে বাড়িতে বেড়াতে যাই। তখন বেশকিছু দিন থাকা হয়।

ওদিকে নিধিও বাড়িতে আসে। সেই সুবাদে ওর সাথে বেশ কিছু সময় কাটে,কথাবার্তা হয়, ভালো বন্ধুত্ব ও তৈরি হয়ে যায়। বলা বাহুল্য সেও তখন এডমিন টেষ্ট শেষ করে অবসর কাটাতে গ্রামে এসেছিল। এরপর আবার ঢাকায় চলে আসি তবে সাথে করে নিয়ে আসি ওর ফোন নাম্বার। এরমধ্যে সে আমার ফেইসবুক থেকে শুরু করে হোয়াটস এপ, সবজায়গায় বন্ধু বনে গিয়েছে। অনেক কথা বার্তা হয়। তার কোথাও চান্স হয় না,দ্বিতীয়বার মেডিকেল এ ভর্তির আশায় কোচিং এর জন্য ঢাকায় আসে। সেই সুবাদে দেখা ও হয় দু একবার। এরমধ্যে আমি অনুভব করি কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়েছি তার প্রতি।

আমার কথাগুলো জানাবার আগেই সে জানায় তার একটা বয়ফ্রেন্ড আছে,তবে ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। সবধরণের যোগাযোগ বন্ধ করে দেই,পাগলপ্রায় হয়ে যাই। অবশেষে একান্ত নিরুপায় হয়ে একদিন আমার মনের কথাগুলো বলে দেই। ফলে যা হবার তাই হয়,সে আমাকে একান্ত বন্ধু হিসেবেই পেতে চায় এটা শ্রেফ জানিয়ে দেয়। এরপর অল্পসল্প যোগাযোগ বা যোগাযোগহীনতার মাঝেই সময়গুলো কেটে যায়। শেষ মেডিকেল পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার দিন ফোন দেই। চান্স পায়নি,ফোনের ওপার থেকে কাঁদছিল খুব।

আবার যোগাযোগ শুরু পুরোদমে। অনেকবার একেবারে যোগাযোগ বন্ধ করে দেবার চেষ্টা করেছি,কোন লাভ হয়নি। বেশিরভাগ সময়ই একা লাগে,হীনমন্যতায় ভুগি। আবেগ ব্যাপারটা হয়তোবা আমার মধ্যে একটু বেশিই কাজ করে। খুব বেশি খারাপ লাগলে অনুভূতিগুলো লিখে রাখতে ভালোলাগে, অদ্ভুত এক প্রশান্তি আসে তখন ভিতর থেকে।

আগে ডায়েরী লিখতাম প্রতিদিন, ডায়েরীর ফাঁকা পৃষ্ঠা গুলো এখনো পড়ে আছে তবে সময়ের অভাবে কলমের আঁচর কাটা হয়না। আরেকটা কথা,ও বলেছে ওর বয়ফ্রেন্ড এর সাথে ওর সম্পর্কের গভীরতা অনেক, আপাতত ওর বয়ফ্রেন্ড এর সাথে তেমন সুসম্পর্ক যাচ্ছে না। ওর অজস্র সময়,আমাকে সময় দিতে তাই কার্পন্য করেনা। ওর সাথে সারাক্ষণ ফোনে কথা বলতে বা ঘোরাঘুরি করতে ভালো লাগে। তবে ও আমাকে নাকি শুধু বন্ধু হিসেবেই দেখে(যদিও আমার কাছে নিছক রসিকতা বলে মনেহয় ব্যাপারটা)। আজ রাতে এ ব্যাপারে একটু কথা হলো, আমি তার শুধুই বন্ধু। আমার ফাইনাল এক্সামের চারদিন বাকি,পড়াশুনা হচ্ছে না একদম। এমতাবস্থায়, এরকম একটি অসঙ্গায়িত বন্ধুত্ব, আমি,আমার ক্যারিয়ার কীভাবে, কী করে কোনটা ঠিক রাখবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।

পরামর্শ :

প্রথমে বলি, তোমার লেখার হাত খুব ভালো। নিজের কথাগুলো খুব সুন্দর করে ভাষায় রূপ দিতে পারো। তোমার সাথে যেটা হচ্ছে সবার সাথেই সেরকমটা হয়। কাউকে ভালো লাগে কিন্তু শুধু বন্ধুই হয়ে থাকা- ব্যাপারটা আর যাই হোক সহনীয় নয়। কিন্তু কিই বা করার আছে? দেখ তুমি যেহেতু মেয়েটিকে পছন্দ করো সেহেতু তুমি তার ভালো চাও নিশ্চয়ই। তুমি এটাও চাও যে সে ভালো থাকুক। তাহলে সে যখন অন্য কাউকে ভালোই বাসে আর সে মানুষটাও যদি তাকে সত্যিই ভালোবাসে তোমার উচিত সেটাকে মন থেকে একসেপ্ট করে নেয়া। তারা পরস্পরের সাথে ভালো আছে, নিধি মেয়েটা ভালো থাকুক- সেটাই তো তুমি চাও, তাই না? আর সত্যি একটা কথা বলবো? পৃথিবীর সবচে সুন্দর সম্পর্ক হচ্ছে বন্ধুত্ব। হ্যাঁ বন্ধুত্ব। একেবারে নিঃস্বার্থ নির্ভেজাল একটা সম্পর্ক। জীবনে এমন কোনো বন্ধু পাওয়া বা হওয়া যাকে তুমি জীবনের সব কিছু সুখ দুঃখ হাসি কান্না শেয়ার করতে পারো, এমনটা হওয়া কারো বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড হবার চাইতে অনেক বড় একটা কিছু। তুমি হয়তো ভাবছো আমি সান্ত্বনা দিচ্ছি কিন্তু না। মেয়েটি তোমাকে একদম পিওর একটা বন্ধু হিসেবে দেখে, তার কাছে তোমার একদম অন্য একটা স্থান আছে, সে স্থানটা আস্থার, ভালো লাগার, বন্ধুত্বের। কারো সেরকম একজন বন্ধু হতে পারা নিঃসন্দেহে গর্বের ব্যাপার। তোমার পাশে তোমার বন্ধু আছে… এই একটা অনুভূতিই তো তোমাকে জিইয়ে রাখতে যথেষ্ট! কাউকে ভালো লাগা ভালোবাসা মানেই প্রেম হতে হবে কেন? একটা ছেলে আর মেয়ের মধ্যে শুধু প্রেমেরর সম্পর্কই হতে হবে কেন? বন্ধুত্বও তো হতে পারে।এমনও তো হতে পারে তোমার জীবনে প্রথম মেয়ে বন্ধু বলে তাকেই তোমার সবকিছু মনে হচ্ছে। আরো বন্ধু বানাও, আরো মানুষের সাথে মেশো, তারপর দেখবে বুঝতে পারবে কে বন্ধু আর কে বন্ধুর থেকে বেশি কিছু। এখন তোমার ম্যাচিউরিটি কম, আবেগ বেশি। একটু বয়স হোক, তখন বুঝতে পারবে সত্যিকারের ভালোবাসা কিরকম। আমি বলছিনা এখন তোমার অনুভূতি গুলো মূল্যহীন। কিন্তু ভালো লাগা আর ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্য বোঝার বোধ এ বয়সে আসে না বলেই মানুষ ভুল মানুষকে ভালোবাসে ভেবে ভুল করে। সুতরাং ভালো লাগার অর্থ প্রেম না ভেবে বন্ধুত্ব ভাবো। সময় যেতে যেতে নিজেই দেখবে বন্ধুদের এরকম কত প্রেম ভাঙলো আর গড়লো জাস্ট এই ভালো লাগা ভালো বাসার পার্থক্য বুঝতে না পেরে। সুতরাং বন্ধুত্বকে বেঁচে থাকার প্রেরণা বানাও আর মন দিয়ে পড়াশোনা করো। ভালোবাসার জন্য সারাজীবন পড়ে আছে কিন্তু এই ছাত্রজীবন একবার চলে গেলে আর ফিরে আসবে না। ধন্যবাদ

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top