একদিন জানতে পারি আমাকে হাসপাতাল থেকে দত্তক আনা হয়েছিল…

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানিয়েছেন নিজের সমস্যার কথা।

“ছোটবেলা থেকে অনেক বেশী বিলাসিতার মধ্যে বড় হয়েছি। বাবা-মা আর দুই ভাইয়ের আদরের ছোট বোন ছিলাম। বড় ভাই আমেরিকাতে সিটিজেন। আর ছোট ভাইয়ের বাইয়িং হাউজের এম.ডি। বাবা ডেভলপিং সাইডের বিসনেস ম্যান। মা গৃহিণী। খুব আনন্দে দিন কাটত আমাদের।

তবে আমি যখন ক্লাস ৫ এ উঠি তখন জানতে পারি যে যাদের আমি আমার বাবা মা বলে জানি তারা আমার বাবা মা না। আমার বয়স যখন তিন মাস তখন তারা আমাকে একটি হাসপাতাল থেকে দত্তক আনেন। আমার আসল বাবা মায়ের খোঁজ তারাও জানেন না। এই কথা জানার পর বিন্দুমাত্র আফসোস হয়নি আমার। কারণ আমিতো বেশ সুখেই আছি। এইভাবে আরো কয়েকবছর কাটে।

ক্লাস ৭ এ আমি আমার এক খালামণির গ্রামে বেড়াতে যাই। সেখানে যেয়ে এক ছেলের সাথে পরিচয় হয়। পরে ঢাকাতে ফিরে এসে লুকোচুরি করে মাঝে মাঝে ছেলেটির সাথে আমার ফোনে যোগাযোগ হতো। তখন শুধুমাত্র ছেলেটির সাথে কথা বলতে ভাল লাগত। জানতে পারলাম, তারা তিন ভাই আর এক বোন এবং তিনিই বড়। তার বাবা কোন কাজ করেন না। মা গৃহিণী। পরিবারের দায়িত্ব তার উপর। তিনি একটি প্রাইভেট কোম্পানি (ঢাকার বাহিরে) তে মধ্যম শ্রেণীর কর্মচারী। তিনি ইন্টারমিডিয়েট কমপ্লিট করেছেন। তারপর থেকে তার প্রতি মায়া আরও বেড়ে যায়। একটা সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। যখন আমি ক্লাস ৮ এর মাঝামাঝিতে ছিলাম তখন এটা পরিবারে প্রকাশ পায় এবং আমাকে আমার পরিবার সরে যেতে বলে। আমি চেষ্টা করেছি তবে পারিনি তাকে ভুলতে। পরবর্তীতে অনেক ঝামেলা হয় দুই পরিবারের মধ্যে। তবে আমি আর সে একমত ছিলাম যে যাই হয়ে যাক আমরা এক থাকব।

তিনি আমার জীবনের প্রতিটি ঘটনা জানতেন। তারপরও কখনো আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন নি। পরিবার থেকে অনেক ঝামেলার পর যখন তারা আর আমাদের আলাদা করতে পারল না তখন সবাই সম্মতি দিল এবং ক্লাস ৯ এর মাঝামাঝিতে আমাদের বিয়ে হলো। বিয়ের সময় এবং পরেও বিজনেস এর কথা বলে তার পরিবার আমাদের পরিবার থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়েছে। আমার বাবা মাও দিয়েছিল। কারণ তারা আমার সুখ দেখতে চেয়েছিল। বিয়ের পর দু’মাস সব ভাল ছিল। আমি আমার শ্বশুরবাড়িতে থাকতাম। আর সে সপ্তাহে একদিন বাড়িতে যেত। দুমাস পর থেকে ঝামেলা শুরু। অকারণে সে ঝগড়া করত। অসহনীয় পর্যায় হলে আমি ঢাকা বাবার বাসায় চলে আসি। দেড় মাস পর আবার সে নিয়ে যায় আমাকে। আবার কিছুদিন ভাল তারপর আবার ঝামেলা। আবার চলে আসা। মাস খানেক বাবার বাড়িতে থাকার পর আবার নিয়ে যেত। তারপর একবার দুজনে মিলে ঠিক করি আলাদা বাসা নিয়ে থাকব। নিলাম। ভালই ছিলাম।

মাসখানেক পর ছোট ছোট ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া আর অশান্তি। আবার ঢাকা আসলাম। এক আপুর পরামর্শে বাবা এক ঈমাম হুজুরের কাছে নিয়ে গেল। পরপর এতবার ঝামেলা হওয়ার জন্য। তিনি দুই তিন দিন পর পরীক্ষা করে জানান আমাদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্টের জন্য আমার শ্বাশুড়ী কুফুরী কালাম করেছেন। উনি কিছু তাদবীর দেন। আল্লাহর রহমতে ফল পেলাম। তিনি ফিরে আসলেন। তবে আবার মাস তিনেক পর ঝগড়া সাথে যোগ হলো অহেতুক সন্দেহ। তার পরিবারকে কিছু জানালে তেমন একটা আমল দিত না। তাই,আব্বু আম্মু রাগ হয়ে আমাকে ডিভোর্স না করিয়ে ঢাকা নিয়ে এলো। এর মধ্যে এসএসসি দিলাম। ভাল রেজাল্ট করলাম। নামকরা কলেজে ভর্তি হলাম। এর মধ্যে তার সাথে আমার যোগাযোগ নেই।

দীর্ঘ ১০ মাস পর এই অগাস্টের ১ তারিখ তিনি যোগাযোগ করেন এবং খুব কান্নাকাটি অনুনয়ও করেন। আমার মন নরম হয়। কারণ আমিও তাকে প্রচন্ড ভালবাসি। ১ তারিখের পর বেশ কয়েকবার ঢাকা এসে আমার সাথে দেখা করেছে সে। তারপর তিনি আমাকে বলেছেন তার চাকরি নতুন হয় ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া। আমরা নতুন করে সংসার করব। তিনি যেখানে থাকবেন আমিও সেখানে থাকব। আমি রাজী হই। ঈদ উপলক্ষে তাদের বাড়িতে যাই আমি সেপ্টেম্বর এর ১৪ তারিখ। সেদিন থেকে তার আবার পরিবর্তন। ঠিক করে কথা বলে না। রাত করে ঘরে আসে। আমাকে সময় দেয় না। অহেতুক রাগারাগি। ঝগড়া করে তার মা সামনে থেকেও কোন আমল দেয় না। উল্টো বলে আমার দোষ।

২৭ তারিখ আমার বাবা মা আমাকে দেখতে তাদের গ্রামে যায়। আর তাদের বলে আমাকে বলে ঢাকা বেড়াতে নিয়ে আসে  ১০ দিন এর জন্য। ঢাকা আসার পর থেকে আমার স্বামী একবারও আমার খোঁজ নেয় নাই। ফোনও করে নাই। আমি ফোন দিলে খারাপ ব্যবহার করে। শাশুড়িও পাত্তা দেয় নাই। তাই খুব দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যাওয়ার সাহস পাই নি। আমার শাশুড়ি আমাকে বলেছে আমি যেন ডিভোর্স পেপার দিয়ে দেই। কিন্তু আমি সত্যি ওই মানুষটাকে অনেক ভালবাসি। আমি চাই সে নিজে থেকে ফিরে আসুক। এই মুহূর্তে আমার করণীয় কি? পরামর্শ চাই।”

পরামর্শ:
দেখো আপু, আমি যা বলবো সেটা তোমার মোটেও ভালো লাগবে না। ঠিক এই কারণেই তোমার প্রশ্নের জবাবটি দিতে এত দেরি করলাম আমি। তোমার বয়স অত্যন্ত কম। এই বয়সে পিতা মাতার মনে কষ্ট দিয়ে এই বিয়েটা করা তোমার জন্য বিশাল ভুল হয়েছে। যে মা বাবা তোমাকে হাসপাতাল থেকে দত্তক এনে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন, কীভাবে তাঁদের সাথে এত বড় অন্যায় করতে পারছো তুমি? তুমি কি একবারও চিন্তা করেছো যে নিজের চাইতে, নিজের পরিবারের চাইতে অযোগ্য ছেলেকে জোর করে বিয়ে করে পিতা মাতার মনে কতটা কষ্ট দিয়েছো তুমি? এটা অন্তত ভাবা উচিত ছিল যে এই মানুষ গুলো নিঃস্বার্থ ভাবে তোমার জন্য করছেন, অন্তত তাঁদের মনে এই কষ্ট না দেয়াটাই উচিত ছিল।

সোজা সাপটা একটা কথা বলি আপু, তুমি ফাঁদে পড়েছ। তোমার বাবা এবং ভাইয়েরা ধনী, এই কারণেই ছেলে ও তার পরিবার তোমাকে ফাঁদে ফেলেছে। ছেলেটি যদি তোমাকে ভালোইবাসত, সে কখনো কোনদিন কোন মূল্যে তোমার বাবার কাছ থেকে টাকা নিত না। তোমাকে গ্রামের বাড়িতে ফেলে রাখতো না। তুমি চলে গেলে সে যে বারবার ফিরিয়ে এনেছে, তার কারণ তুমি সোনার ডিম পাড়া হাঁস। তোমাকে কাছে রাখতে পারলেই তার লাভ। এটা কোন ভালোবাসা না। যদি ভালোবাসা হতো, সে তোমার খোঁজ না নিয়ে থাকতে পারতো না।

আমার মতে, তুমি যদি এই সম্পর্ক চালিয়ে যাও, এর বিনিময়ে কষ্ট ছাড়া কিছুই পাবে না। বয়স কম, মন আবেগ দিয়ে ভরা। তাই ভাবছো যে এই মানুষটি ছাড়া বাঁচতে পারবে না। কিন্তু সত্যি এটাই যে এই লোকটা আজীবন তোমাকে কষ্ট দেবে। শুধু তোমাকে কষ্ট দিলেও হতো, তারা আজীবন তোমার মা বাবা ও পরিবারকে কষ্ট দেবে, তাঁদেরকে সামাজিক ভাবে হেয় করবে ও তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেবে। এই ভালো মানুষগুলোকে এতটা হয়রানি করানোর কোন অধিকার কি আছে?

শোন, কেউ যদি নিজে থেকে বদলে না যায় তাঁকে কেউ বদলাতে পারে না। তাছাড়া এই লোকটি আসলে আগেই এমন ছিল। প্রেমের সময় চোখে রঙিন চশমা আঁটা থাকে বলে কেউই আসল চেহারা দেখতে পায় না। সময়ে সময়ে সবই বের হয়ে আসে। একবার ভেবে দেখো, এখনোই এই অবস্থা তাহলে বিয়ের পর কী হবে? তাচারা তোমার শাশুড়ি তো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে তারা তোমাকে বাড়ির বৌ হিসাবে চায় না।

তোমার এখন একটাই করণীয়। নিজের জীবনের সম্পূর্ণ ডিসিশন পিতা মাতার হাতে ছেড়ে দেয়া। তারা যদি ডিভোর্স করতে বলেন, তাহলে সেটাই করো। তোমার বয়স অনেক কম, পরও জীবন সামনে পড়ে আছে। এখনই গিয়ে সংসারের জোয়াল ঘাড়ে নিতে খুব রোমান্টিক লাগবে। কিন্তু একটা সময় কপাল চাপড়ে কাঁদতে অবে এই ভুলের জন্য। যখন দেখবে নিজের চোখের সামনে জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছে, সংসারের ঘানি টানতে টানতে যখন ক্লান্ত হয়ে যাবে, তখন আর কোনদিকে যাবার পথ পাবে না। আজীবন ব্যর্থ অসুখী জীবনের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে।

এখনো সময় আছে আপু। এই সম্পর্ক আর সিনেম্যাটিক রোমান্সের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো। তুমি আমার সন্তান হলে আমি চাইতাম তুমি মন দিয়ে লেখাপড়া করো আর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাও। তোমার এখনো বিয়ে কেন, প্রেমের বয়সও হয় নি। তাই পিতামাতার সিদ্ধান্তকেই নিজের জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত ধরে নাও। আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি, এতে ঠকবে না। কারণ তুমি সৌভাগ্যবশত খুবই ভালো একটি পরিবারে মানুষ হয়েছ। মা বাবা পরিত্যাক্ত খুব বেশি ছেলেমেয়ের এত ভাগ্য হয় না। পরিবারের সাথে অন্যায় করার আগে কেবল একবার ভাববে, তোমার নিজের মা বাবা কিন্তু তোমাকে কোন মূল্য দেয়নি। এমনকি নিজেদের জীবনে জায়গাও দেয়নি। যারা সেই অবস্থা থেকে এনে তোমাকে মানুষ করেছেন, তাঁদের মনে যেন কোন কষ্ট না হয় তোমার কারণে।

 

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top