মা খোঁজ নেয় না, বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করছেন, দুলাভাই আমার প্রতি আগ্রহী..

প্রশ্নটি আমাদের ফেসবুক পেজে করেছেন : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন তরুণী

ইদানিং খুব অসহায় লাগে। আর আমি ভীষণ একা বোধ করি। এর কারন হল আমার আশেপাশে কোন ভালো ফ্রেন্ড সার্কেল নেই। ভাবছেন ফ্রেন্ডদের জন্য এত মন খারাপ কেন? বিষয়টা হল আমার পরিবার বলতে কিচ্ছু নেই। ২০০৬ থেকে একাই থাকি। হোস্টেলে, তারপর ফ্ল্যাট ভাড়া করে অন্য মেয়েদের সাথে। সেখান থেকে বিভিন্ন মেয়ের বিভিন্ন হিংসামি দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত। ছোট্ট বেলায় আমি আদরে বড় হয়েছিলাম তাই কোন রকম মানসিক কষ্ট আমি সহ্য করতে পারিনা, আজও শিখতে পারিনি। আমার অনেক ভালো কিছু বন্ধু আছে যারা আমার জন্য সব করতে পারে। কিন্তু তারা তো আমার সাথে পড়াশোনা করেনা তাই দেখা কম হয়।

আমার প্রেমিকের সাথে আমার ৮ বছরের সম্পর্ক। ও আমাকে জীবন দিয়ে ভালোবাসে। বর্তমানে আমার জীবনে পাওয়া বলতে এতটুকুই। আমার অনেক কেয়ার করে সে। আর এদিকে পরিবারের সমস্যার কারণে ইয়ার লস হয়ে গেছে অনেক। তাই ছোটদের সাথে ক্লাস করি। ভীষণ হতাশ লাগে। অবশ্য ৩ জন ভালো ফ্রেন্ড হয়েছে নতুন ক্লাসে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২য় বর্ষে পড়ছি এখন। আগে আমার রেজাল্ট খুব ভালো হত আর ফ্রেন্ড সার্কেল খুব স্ট্রং ছিলো তাই ফ্যামিলির সব কিছু ভুলে থাকতে পারতাম। কিন্তু এখন ইয়ার লসের হতাশা প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে কষ্ট দেয়। পড়ায় মন দিতে পারছিনা।

ফ্যামিলির কথায় আসি। বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেছে। বাবাকে বেশি ভালোবাসি বলে মা আমার সাথেও যোগাযোগ করেনা সেই ২০০৬ সাল থেকেই। বাবাও চাকুরীর সুবাদে দূরে থাকেন। কিন্তু আমাকে অনেক বেশি ভালোবাসেন। আর আমার বড় বোন আমাকে মায়ের স্নেহে এতদিন বড় করে তুলেছে। মায়ের অভাব কোনদিন বুঝতে দেয়নি। কিন্তু এখানেও সমস্যা। তার স্বামী তার সাথে অনেক ঝামেলা করে। অনেক মেয়েদের সাথে মেশে। এবং আমার সাথেও কিছু করার চেষ্টা করে। সেই দুঃখে বোনের বাসায় গিয়েছি শান্তি পাইনা। বোনের এই অনিশ্চিত সংসার আমাকে আরো বেশি কষ্ট দেয় আর ইনসিকিউরড ফিল করায়।

এদিকে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার কথা চিন্তা করছেন যা নতুন করে ঝামেলা বাড়াবে। এসব চিন্তায় ব্যবসায়ও ভয়াবহ লস খেয়েছি। আপু, আমি একটা নতুন জীবন চাই। দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন। কলেজ জীবনেও এসব পারিবারিক সমস্যা ছিলো আমার, কিন্তু সে সময় আমি অনেক আত্মবিশ্বাস নিয়ে থাকতাম। কিন্তু এখন আর সেটা পাইনা কেন? আমি দেখতে খারাপ না আর আল্লাহর রহমতে বাবার অর্থ সম্পত্তিও আছে, ভালো জায়গায় পড়ছি, আসেপাশের মানুষ আমাকে অনেক গুনী আর শৌখিন বলে। অনেক প্রসংসা করে। তারপরও আজকাল আমার মন খুব ছোট হয়ে থাকে। মনে হয় আমার কিচ্ছু নেই। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখিয়েছি কিন্তু তেমন একটা লাভ হয়নি।

আমি জানি আমার দৃষ্টিভঙ্গি এর জন্য দায়ী। কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাসগুলো গেল কই আপু? দয়া করে সাহায্য করুন। আমার সবসময় মনে হয় আমার কোন শিকড় নেই। পরিবার বলতে কিচ্ছু নেই। আমি সম্মান নিয়ে বাঁচতে চাই আপু। আমার মেইন প্রশ্ন হল যে এসব ঘটনা তো আমার জীবনে আগেও ছিলো। হুট করে গত এক বছরে আমি এত ভেঙ্গে পড়লাম কেন? আমি আমার হারানো কনফিডেন্স ফিরে পেতে চাই।

পরামর্শ

দেখো আপু, দীর্ঘদিন একা থাকতে গিয়ে বা পরিবারিক সমস্যায় ভুগলে মানুষের অনেক রকমের মানসিক যন্ত্রণা দেখা দেয়। এই সমস্তই তৈরি হয় নিঃসঙ্গতা থেকে, ব্যর্থতা থেকে। তোমার আত্ম বিশ্বাসও এই কারণেই হারিয়ে গিয়েছে আর এটা খুবই স্বাভাবিক। তোমার মন একটু ভালো থাকতে চায়, একটু সুখী হতে চায়, একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চায়। এটা কোন মানসিক সমস্যা নয় যে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাবে। বরং তোমার প্রয়োজন একজন কাউন্সিলার, যার সাথে তুমি নিয়মিত নিজের সমস্যা শেয়ার করতে পারবে ও নানান রকম বুদ্ধি নিতে পারবে। সেটা অপরিচিত মানুষ হলেই ভালো। কারণ প্রায়ই আমরা পরিচিত মানুষদেরকে নিজের দুর্বলতা গুলো বলতে পারি না। সবচাইতে ভালো হয় একজন পেশাদার কাউন্সিলারের কাছে গেলেই। নাহলে আমার সাথেও দেখা করতে পারো। বন্ধু হিসাবে তোমার কথাগুলো শুনব আমি।

নিজের যখন বোঝ যে সমস্যা দৃষ্টিভঙ্গির, তাহলে সেটা বদল করার চেষ্টাই তো করতে হবে। তাই না? শোন, পরিবার নেই বলে তুমি যেমন কষ্ট পাচ্ছ, অনেকেই আবার কষ্ট পাচ্ছে পরিবার আছে বলে। কত মেয়ের পরিবার তাঁদেরকে জোর করে বিয়ে করাচ্ছে, লেখাপড়া করতে দিচ্ছে না, মা বাবার ডিভোর্স না হয়ে তীব্র অশান্তির মাঝে দিন কাটছে। সেই তুলনায় তুমি অনেক স্বাধীন, মুক্ত। এই মুক্তি উপভোগ করতে শেখ। তোমার জন্য স্কাই ইজ দ্যা লিমিট। নিজের জীবন একেবারেই নিজের মত করে সাজানোর স্বাধীনতা তোমার আছে।

শোন মেয়ে, বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায় দোষের কিছু নেই। তিনি একা, দুই কন্যাই তাঁর এক সময় নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে। তখন বাবাকে কে দেখবে? বাবারও তো একটু ভালোবাসার চাহিদা আছে। তাই না? তাই ব্যাপারটা মেনে নিতে শেখ। আর তোমার বড় বোনের জীবনটা অনেক এলোমেলো। কখনো যদি ওই লোকটা আপাকে ডিভোর্স করে দেয়, অবাক হবার কিছু নেই। যে বোন মায়ের মত লালন করেছে, এই বোনের দায়িত্ব তখন তোমাকে নিতে হবে না? অবশ্যই হবে। তাই সেই অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তোল আপু। তুমি যদি হেরে যাও, তোমার বোনটাও তাহলে হেরে যাবে। বোনের দুর্বলতা নয়, এখন তাঁর শক্তি হবার সময়।

আরেকটা জিনিস কি জানো, তোমার জীবনে পরিবর্তন দরকার। এক ঘেয়ে কষ্ট আর হতাশার বাইরে আমূল একটা পরিবর্তন দরকার। তোমার বর্ণনা শুনে বুঝতে পারছি যে বিয়ের বয়স হয়েছে। প্রেমিক যেহেতু ভালো, বিয়ে কেন করে ফেলো না? বিয়ের পর নতুন সংসার, শ্বশুরবাড়ি, নতুন মানুষ সব মিলিয়ে কিন্ত কষ্ট জিনিসটা আর স্পর্শ করতে পারবে না। জীবনটা আবার নতুন করে শুরু হবে। তাছাড়া বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার আগে তোমার বিয়েটা হয়ে যাওয়াই ভালো। তাহলে দুলাভাইয়ের যন্ত্রণা থেকেও বেঁচে যাবে।

আমার কথাগুলো ভেবে দেখবে আপু। অনেক দোয়া তোমার জন্য।

 

 

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top