সে আমার পা ধরে মাফ চায়, কিন্তু কিছুদিন পর আবারও একই অবস্থা…

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানিয়েছেন নিজের সমস্যার কথা।

“আমার বয়স ২৫, আমার একটি দেড় বছরের বাচ্চা আছে। আমি ২০১১-তে বিয়ে করি। ভালোবাসার বিয়ে ছিলো। ৩ বছর প্রেম করে বিয়ে করি আমরা। একা বিয়ে করি আমি। কিন্তু কিছুদিন পর পরিবারে জানাই। তখন ওরা আমাদের আবার কাজী অফিসে নিয়ে বিয়ে দেয়। কিন্তু আমার শ্বশুর শাশুড়ি কথাটা জেনেও ইগনোর করলো। ওরা আমাকে মেনেই নিলোনা। আমার মা বাবাও তেমন মেনে নিলোনা। কারণ স্বামীর পরিবারের আর্থিক অবস্থা আমাদের চাইতে অনেক খারাপ। তবুও আমার কথা চিন্তা করে কোনরকম মেনে নিলো ওকে।  কিন্তু ওর মা বাবা এমন এক ভাব করলো যেন আমি কত বড় অপরাধ করে ফেলেছি।

যেমন, বাসায় ওর সাথে একটু ঝগড়া হলেই ওর মা আমাকে ফোন করে আজেবাজে গালিগালাজ করে। তখন ও কোন কাজ করেনা। আমার পরিবার আর আমি ভেবেছি ও ছাত্র। পড়াশোনা শেষ করে কাজ করে আমাকে বাসায় নিয়ে যাবে। কিন্তু অনেকদিন এভাবেই চলে যায়। আমি তখন ওকে অনেক বুঝালাম, চল আমরা দুজনে জব করে বাসা নেই। সংসার করি। কিন্তু ও খুব নারাজ। বলে তোমার বাসা থেকে টাকা নাও। আমি ব্যবসা করবো। পরে সংসার করবো। ওর বাসায় গিয়ে বললে ওরাও একই কথা বলে। আমি অনেকবার কাপড় গুছিয়ে ওর সাথে চলে যেতে চেয়েছি কিন্তু ও কিছুতেই নিবেনা। ওর মার সাথে ফোনে কথা বলে, ও জিজ্ঞাসআ করলেই উনি না করেন আমাকে আনতে। কী আর করবো আমি। তখন মেনে নিলাম ভাগ্যকে। সম্পর্ক ঠিক রাখার জন্য ওকেই আমাদের বাসায় আসতে বলি সপ্তাহে ২/৩ বার। তারপর আমার বাবার কাছে ওর মা বাবা একদিন এসে বলে আপনার জামাইকে বাইক কিনে দেন। ও নাকি বাইক না পেলে সুইসাইড করবে। কিন্তু আমাকে কিছুই বলেনি ও এই ব্যাপারে।

আমি বাবাকে তখন টাকা দিতে মানা করি। কিন্তু বাবা বলল, জামাই একটা জিনিস চাইলো, দিয়ে দেই। বাইক দিলো। ও খুব মজায় আছে বাইক আর বন্ধুদের নিয়ে। কিছুদিন পর আমি খুব অনুরোধ করলাম একটা কাজ করে বাসা নিতে। ও বলল তোমার বাবার কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নাও আর আমি আমার বাইকটা বেচে একটা ভালো ব্যবসা করি। আমি আমার বাবা থেকে টাকাটা নিলাম। ও পুরো টাকাটা না নিয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নিয়ে অন্য আরেকটা সুন্দর বাইক কিনে ফেললো। আমি তো অবাক। জিজ্ঞাসা করার পর আমাকে বলে বাইকেরই তো ব্যবসা করবো। এই দুইটা বাইক বিক্রি করবো। আমি বিশ্বাস করলাম। আমি তখন প্রেগন্যান্ট হলাম। এক মাস হবার পর আমি আমাদের বাসায় থাকতে বললাম সন্তান হবার আগ পর্যন্ত। ও থাকতে শুরু করলো কিন্তু অন্য ঘরে ঘুমাতে হল ওকে। কারণ ডাক্তার শারীরিক সম্পর্ক করতে মানা করেছিলেন।

কিছুদিন পর দেখলাম ওর ব্যবহার কেমন যেন খিটখিটে। আমাকে যতটা কেয়ার করা উচিত তা তো করেই না, উলটা ডাক্তারের কাছে যেতেও বিরক্ত হয়। সারাটা রাত ফেসবুক চালায়। সারাদিন ঘুমায়। জিজ্ঞাস করলে বলে, আরে শুধু গেমস খেলি আর কিছুনা। কিন্তু ৫ মাস হওয়ার পর একদিন ওর মোবাইল ঘেটে দেখি এক মেয়ের সাথে প্রেমের কথোপকথন রেকোর্ড করা। খুব প্রেম। মেয়ের রাগ ভাঙ্গাচ্ছে আমার স্বামী। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। আমি এত কষ্ট পেয়েছি যা বলার মত না। ওকে খুব চিৎকার করে ঘুম থেকে উঠালাম। ও উঠে আমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করলো। আমি বললাম বাসা থেকে চলে যেতে। ও চলে গেল আর কোন খোঁজ নেয়না। আমি খুঁজে খুঁজে একটা মেয়ের নম্বর পেলাম। ওই মেয়ের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম ও নাকি ওই মেয়েকে বাইকে করে ঘুরাবে বলে প্রপোজ করেছে অনেকদিন আগে। এখন ওদের প্রেম চলে। আমার কথা জানার পর মেয়ে সরে গেলো।

কিছুদিন পর আমার মন দুর্বল হল। ওকে আবার ডেকে আনলাম। ও আবার থাকতে শুরু করলো। এখন অত্যাচার আগের চেয়েও বেড়েছে। এখন আরও মেয়েদের সাথে কথা বলে, টাকা চায় আমার কাছে বাইক সারাবে বলে। আমি বোকা ছিলাম। দিয়ে দিতাম। আর ভাবতাম সন্তান হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি ওর অনেক ম্যাসেজ মেয়েদের সাথে দেখে চিৎকার করতাম। বকতাম ওকে। সবাই শুধু ওটাই শুনতো। আমিই খারাপ সবার চোখে। ওর আচরণও খুব খারাপ হল আমার সাথে। এইভাবে করে দিন কাটলো। একদিন সন্তান হল। তখন ও আমার বাসায় থাকে। আমি সুস্থ হয়ে ওর কাছে যেতে চাই। ও দূরে সরিয়ে দেয়। যত সবকিছু ঠিক করতে চাই, তত ও দূরে সরে যায়। আমার রুমে ঘুমাতে চায়না। আমার ভাইয়ের সাথে ঘুমাতো। আমার ভাই আর ও মিলে আমার মায়ের কাছ থেকে অনেক টাকা নেয়, মিথ্যা বলে। তারপর একদিন ও রুমে ঘুমাচ্ছে, আমি ঢুকে দেখি ও ম্যাসেজিং করছে। মোবাইলটা নিয়ে দেখি এক মেয়ের সাথে চ্যাটিং। সে কি প্রেম! আমি তখন ওকে বললাম চলে যেতে। আর যেন না আসে। ও চলে গেল। আমিও ভাবলাম ওকে ছেড়ে দিবো। কিন্তু পরে ভাবলাম সন্তানের কি দোষ। সব ঠিক হয়ে যাবে আমি যদি চেষ্টা করি। হয়তো আমারই দোষ।

তখন আমি ওকে বাসায় আসতে বললে ও তো আসেনা, উলটা গালাগালি করে। আমি যোগাযোগ বন্ধ করি। একদিন ওর মা বাবা জানায় ও নাকি অনেকদিন ধরে ইয়াবা খায়। আমার ভাইও নাকি খায়। ওরা সব দোষ আমার উপর দিলো। আমি নাকি ওকে ইয়াবা খাওয়ানো শিখিয়েছি। আমি তখন ভাবলাম ভালোবাসা দিলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক হয়না। ও কেমন যেন দূর দূর। ফোনে তেমন কথা বলেনা। কিন্তু বেশিদিন যদি ফোন না করি বাসায় এসে মাফ চায়। বারবার এরকমই হয়। তখন ওর মা আমদেরকে ওদের গাজিপুরের বাসায় নিয়ে যায় সংসার করার জন্য। যাতে উনার ছেলে ভালো হয়ে যায়। আমিও গেলাম। কিন্তু একদিন এক মেয়ের কল আসলো। ও আমাকে কোন ব্যাখ্যাই দিলোনা। উলটা ওর মা আর ও মিলে আমাকে যা তা শুনালো। আমি কাঁদলাম। চলে আসতে চাইলাম। ও আমার গায়ে হাতও তুললো। আমি বাসায় এসে ঐ মেয়ের নম্বরে ফোন করে জানলাম ওদের নাকি সম্পর্ক চলছে। আমি নাকি ওর বড় বোন। সাথে সাথে আমি আমার বাবাকে জানিয়ে দিলাম আমি ওকে ডিভোর্স দিবো। ঐদিনই ওর বাবা মা আর ও আসে আমাদের বাসায়। ও আমার পায়ে ধরে মাফ চায়। ওর মা বাবা বলে বাচ্চাটার কথা ভাবো। তাই আমি মাফ করে দেই। কিন্তু কিছুদিন পর ঐ একই অবস্থা। সন্তানের কোন খরচ দেয়না। ডাক্তারের কাছে যাওয়া, ঘুরতে যাওয়া, কিছুই না। শুধু আসে মাঝে মাঝে রাতে থাকতে। সকালে চলে যায়। ওর সাথে কিছুদিন কথা না বললেই ও বাসায় চলে আসে। বাবুকে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। এদিকে বাবুও তার বাবা চিনে ফেলেছে।

কিন্তু ও কেমন যেন। ইচ্ছে হলে আসে, না হলে আসেনা। নেশার জন্য পাগলের মত চলে যায়, কিন্তু স্বীকারই করেনা যে নেশা করে। ওদের বাসায় আবার গিয়েছিলাম থাকতে কিন্তু ও ওখানে থাকবেনা। ওদের এখানের বাসা বস্তি বাসা। বাবুকে নিয়ে থাকতে পারবোনা। ওর মায়ের ব্যবহার খুব খারাপ। জঘন্য মহিলা। ও একটুতেই গায়ে হাত তুলতে চায়। আমি এখন শুধু ওকে ছাড়তে চাই। কিন্তু সবাই বলে বাবুর কী হবে। আমিও ভাবি বাবু কি আমাকে খারাপ ভাববে? আমার এখন কী করা উচিত? আমি বাবুকে ছাড়া থাকতে পারবোনা। ডিভোর্স দিলে বাবুকে যদি নিয়ে যায়?”

পরামর্শ:
কেকটা আবেগের ভুলে মানুষ কীভাবে নিজের জীবনটা হাতে ধরে নষ্ট করে ফেলে, সেটার একটা উদাহরণ আপু আপনার জীবন। প্রেম করে ভুল মানুষকে বিয়ে অনেকেই করে। কিন্তু যে স্বামীর এই অবস্থা, বেকার ও চরিত্র খারাপ, সেই স্বামীর বাচ্চা কেন গর্ভে ধারণ করতে গেলেন আপনি? আপনার কোন অধিকার ছিল না একটা মাসুম শিশুকে আপনাদের জীবনের এই অশান্তির মাঝে এনে ফেলার। যে লোক নিজের স্ত্রীর খেয়াল রাখতে পারে না, স্ত্রীকে একটা সংসার দিতে পারে না, সেই লোক বাচ্চা হলে ঠিক হয়ে যাবে- আমি বুঝিনা কেন এমন ভ্রান্ত ধারণা পুষে রাখে আমাদের সমাজ।

যাই হোক, আপনার এখন একটাই করণীয় আপু। আর সেটা হচ্ছে চোখ বন্ধ করে ডিভোর্স দিয়ে দেয়া। সেটা আপনি খুব সহজেই পারবেন। ডিভোর্স দেয়ার পর্যাপ্ত কারণ আপনার কাছে আছে। স্বামী ভরন পোষণ দেয় না, নেশা করে, চরিত্র খারাপ ইত্যাদি কারণ যথেষ্ট। আপনি যেটা দেবেন সেটাকে “খোলা তালাক” বলে। একজন কাজী সাহেবের সাথে কাবিন নামা নিয়ে যোগাযোগ করুন, তিনিই বলে দেবেন কী করতে হবে। আপনি নিজের ইচ্ছায় যদি স্বামীর সাথে মিলমিশ না করেন, তাহলে এই তালাক কেউ ঠেকাতে পারবে না।

এই ভুল ধারণায় ভুগবেন না আপু যে লোকটি আপনাকে ভালোবাসে। সে আপনাকে ভালোবাসে না, কখনো ভালোবাসেনি। সে কেবলই আপনার বাবার টাকার জন্য ফাঁদে ফেলে আপনাকে বিয়ে করেছিল। টাকা আপনার হয় এক কথা। কিন্তু নিজের বাবার রক্ত পানি করা টাকা কেন আপনি নিজের স্বামীকে দেবেন? আপনার বাবা মায়ের দিকটা বিবেচনা করবেন না? স্বামী নিজে তো বিপথে গিয়েছেই, আপনার ভাইকেও নিয়ে গেছে। মা বাবার দুটি সন্তানের জীবনেরি যদি এই হাল হয়, তাঁরা কী নিয়ে বাঁচবেন বলুন তো।

আর যেখানে সন্তানের প্রশ্ন, বাচ্চা এখন এত ছোট যে কিছদিনের মাঝে বাবাকে ভুলে যেতে তাঁর সময় লাগবে না। এই বাবা কী দেবে নিজের সন্তানকে? কী পালন করবে সন্তানের দায়িত্ব। বরং দেখা যাবে বড় হয়ে দোষারোপ করবে যে কেন আপনি তাঁকে এই অসহ্য জীবন দিলেন। কেননা একজন নেশাখোর পিতার সন্তান হয়ে কষ্ট ছাড়া আর কিছুই পাবে না সে। আপনি ডিভোর্সের আয়োজন করুন আপু। সন্তান মানুষ করার জন্য মা-ই যথেষ্ট। আপনার মা বাবা তো আপনার পাশেই আছেন। আর স্বামী বা তাঁর পরিবার কিছুতেই সন্তান আপনার কাছ থেকে নিতে পারবে না। প্রথমত তাঁদের নেয়ার ইচ্ছাই হবে না। দ্বিতীয়ত চাইলেও পারবে না। স্বামীর কীর্তি কপাল করতে ফাঁস করে দিলেই তাঁরা কেস হেরে যাবে যদি কেস করতে চায়।

আর হ্যাঁ, আপনি ডিভোর্সের আবেদনের পাশাপাশি থানায় একটি জিডি করবেন এই মর্মে যে আপনার বা আপনার সন্তানের কোন ক্ষতি হলে সেটার জন্য আপনার স্বামী ও শাশুড়ি দায়ী। তালাকের নোটিশের সাথে এই জিডির একটা কপিও পাঠাবেন। শ্বশুরবাড়ির কেউ আর আওয়াজ করার সাহস পাবে না।

 

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top