নয় বছরে ওকে কাছে পেয়েছি মাত্র ছমাস, দুবার করেই বেবি নিতে চেয়েছিলাম

পাঠকের প্রশ্ন : আপু, আমার বিয়ে হয়েছে নয় বছর হচ্ছে। স্বামী বিদেশে থাকে। নয় বছরে ও দেশে এসেছে দুবার। তিন মাস করে ছিল। এ নয় বছরে ওকে কাছে পেয়েছি মাত্র ছমাস। দুবার করেই বেবি নিতে চাইছিলাম, কিন্তু হয়নি। আমার বয়স এখন ২৩ বছর আর ওর ২৭। ওর বড় ভাই আমাদের পরে বিয়ে করে। তাদের একটি মেয়ে আছে দুবছরের। আমার খুব খারাপ লাগে। আমার চারবছর পর বিয়ে করে তাদের একটি মেয়ে আছে। আর আমি আগের মতোই আছি।

আগে এমন লাগত না। যদি শুনি কারো বেবি হয়েছে আমার খুব কষ্ট লাগে। ও তো বিদেশে থাকে তাই সে চায় একেবারে চলে আসতে। কিন্তু আমি রাজি ছিলাম না। ভাবতাম- দেশে এসে কী করবে? বেবি হলে কি করে পড়াশোনা করাব এসব। সে আবার বেশি পড়াশোনাও করেনি তো তাই। আর এখন মনে হয় দেশে চলে এলেই ভালো হবে। একটি বেবি ছাড়া জীবনে কি মূল্যে আছে! আমার সব সময় খুব খারাপ লাগে। আর খুব টেনশনও করি।

ও চায় দেশে এসে পুকুরে মাছ চাষ করবে। আর এটা-সেটা করবে। সে বলে মানুষ কি না খেয়ে থাকে? নয় বছরে তুমি কী পেলে আর আমি কী পেলাম? সত্যিই তো কিছু পাইনি। না ওকে কাছে পেয়েছি, না হয়েছে টাকা। সবার কথা চিন্তা করে, এখনো শুধু পরিবারের কথাই ভাবতে হয়। তারা কী ভাববে আমাদের কথা? সত্যিই ও যখন দুবার দেশে এলো, দুবারই ঝগড়া করে এসেছে। আবার এলেও তাই হবে। আর যদি তাদের কথামতো আসে তাহলে হয়তো আরো দুই থেকে তিন বছর পর আসতে হবে। এখন ও চায় একেবারে চলে আসতে। আমিও চাই। এ কথাটা কেউ জানে না আমি আর ও ছাড়া। আমার আর ওর পরিবার কেউ মেনে নেবে না এটি। আমি কারো কাছে বলতে পারছি না কথাটা।

আমি জানতে চাই আমাদের সিদ্ধান্তটি কি সঠিক নাকি ভুল? আমিও আর পারছি না এভাবে থাকতে। অনুগ্রহ করে বলুন আপু, আমাদের কী করলে ভালো হবে?

পরামর্শ : আপনাদের চিঠি পড়ে খুব কষ্ট হচ্ছে, আপু। পরিবারের ভরন পোষণের কথা চিন্তা করে প্রবাসে পড়ে থাকার চাইতে কষ্ট বুঝি আর কিছুতে নেই। সবচাইতে কষ্টকর এটাই লাগছে যে আপনার শ্বশুরবাড়ির লোকজন কেবল নিজেদের স্বার্থটাই দেখছেন। তাঁদের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে যে আপনাদের দুজনের জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে, এটা তারা চিন্তা করছেন না। সত্যি বলতে কি, এটা আমাদের সমাজেরই বাস্তব চিত্র। কেবল আপনারাই নন, আপনাদের মত আরও অনেক দম্পতিই নিজেদের পরিবারের কথা ভেবে ক্রমাগত দাম্পত্য সুখ বিসর্জন দিয়ে চলেছেন। আর এই বিসর্জন দিতে দিতে ভালোবাসাটা কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে! মানুষ দুটি ক্রমশ হয়ে পড়ছেন বিষণ্ণ আর হতাশাগ্রস্থ।

যাই হোক আপু, আমি বাস্তবতার নিরিখে আপনাদের দুজনকেই কিছু কথা বলতে চাই। এমন হতেও পারে যে কথাগুলো হয়তো আপনাদের ভালো লাগবে না। কিন্তু অনুরোধ থাকবে যে একটু ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা করবেন-

দেখুন আপু, আপনাদের দুজনের বয়সই এখনো অনেক কম। আপনি মাত্র ২৩ আর তিনি ২৭। এখনই কিন্তু বাচ্চার জন্য হাহাকার করার কোন প্রয়োজন নেই। বুঝতেই পারছি যে আপনারা খুবই কম বয়সে বিয়ে করেছেন, তখন হয়তো আপনাদের কারোই বিয়ের বয়স হয়নি। সত্যি বলতে কি, আপনাদের এখন যা বয়স, সেই বয়সেও আজকাল বহু মানুষ বিয়ে করেন না। ইদানীং কিন্ত সকলেই নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, ভবিষ্যৎ জীবন অ সন্তানের জন্য টাকা সঞ্চয় করে তবেই বিয়ে করেন। আপনি যে একটি বাচ্চার জন্য এত অস্থির হচ্ছেন, এটা নিয়ে আদতে অস্থির হওয়ার কিছুই নেই। আপনার হাতে এখনো যথেষ্ট সময় আছে সন্তান নেয়ার। কেবল আরেকজনের বাচ্চা হয়েছে বলেই আপনারও হতে হবে, এই ভাবনাটা কিন্তু মোটেও ঠিক নয়। আরেকজনের সাথে নিজের জীবন ও দাম্পত্য সম্পর্ক মেলানোর চেষ্টা করলে ভীষণ ভুল করবেন, আপু। এখন আপনাদের দুজনেরই জীবন গড়ার বয়স, ফ্যামিলি প্ল্যানিং আরও একটু পরে করলেও কোন সমস্যা হবে না। কে বলেছে আপনাকে যে সন্তান ছাড়া জীবনের কোন মূল্য নেই? তাহলে পৃথিবীতে যাদের সন্তান নেই, তাঁদের জীবন কি মূল্যহীন হয়ে পড়েছে? সবচাইতে বড় কথা, ২৩ খুবই কম বয়স। ইদানীং নারীরা ত্রিশে গিয়েও প্রথম সন্তান গ্রহণ করে থাকেন।

একটা কঠোর বাস্তব বলি, আপু- আমি মনে করি আপনার স্বামীর ভাবনাটি ঠিক নয়। হ্যাঁ, মানুষ কিন্তু আসলেই না খেয়ে থাকে। এদেশে এখন লাখ লাখ বেকার ছেলে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। দুই বেলা দুই মুঠো ভাত খাওয়া আর ভালভাবে সচ্ছল জীবন যাপন করার মাঝে কিন্তু আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এখন আপনি স্বামী বা বাচ্চা ছাড়া থাকতে পারছেন না, মনে হচ্ছে এসব না পেলে জীবন অর্থহীন। কিন্তু যখন স্বামী দেশে এসে একটা সচ্ছল সংসার দিতে পারবেন না, কিংবা বাচ্চাকে একটা ভালো জীবন দেয়ার মত টাকা আপনাদের হাতে থাকবে না- তখন এই স্বামীকেই আপনার অসহ্য বোধ হবে। শুনতে খুব খারাপ শোনালেও এটাই সত্য যে অর্থ ছাড়া সংসার অচল। অভাব থাকলে সম্পর্কেও সমস্যা এসেই যায়। নিজের সন্তানকে একটা সুন্দর জীবন দিতে না পারলে তখন নিজেই পস্তাবেন, কিন্তু আর কোন উপায় থাকবে না। দেশে এসে মাছ চাষ করে জীবন কাটিয়ে দিব, এটাও বেশ ছেলেমানুষি একটা ভাবনা। কারণ একটা ব্যবসা শুরু করতেও টাকা চাই। একই সাথে চাই অভিজ্ঞতা, সঠিক প্ল্যানিং ও ব্যবসা দাঁড় করানোর জন্য পর্যাপ্ত সময়। কোন কিছুই রাতারাতি হবে না। যেহেতু আপনার স্বামীর শিক্ষা বেশিদুর নয়, সেক্ষেত্রে কাজটা তার জন্য যথেষ্ট কঠিনও হবে।

এত কথা বললাম এই কারণেই যেন পরিস্থিতিটা আপনারা বুঝতে পারেন। কেবল আবেগের ঝোঁকের মাথায় হুট করে দেশে চলে আসাটা বড় ধরণের বোকামি হবে এই মুহূর্তে। কিন্তু অন্যদিকে যেহেতু আপনারা পরস্পরকে থেকে দূরে থাকতে পারছেন না এবং সেটা উচিতও নয়, সেক্ষেত্রে আপনাদের সামনে একটাই উপায় আছে। আর তা হলো দুজনে গুছিয়ে নতুন একটা জীবন শুরু করার আগে আরও একটু ধৈর্য ধরা। জীবন কখনো কাউকে ক্ষমা করে না, একটা ভুল সিদ্ধান্তের মাসুল হাতে নাতে বুঝিয়ে দেয়। তাই স্বামী চট করে ঝোঁকের মাথায় দেশে ফেরার চাইতে দুজনে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন। খুব সুন্দর করে একটা প্ল্যান গুছিয়ে নিন যে দেশে ফিরে স্বামী কী কাজ করবেন আর কীভাবে করবেন। অন্যদিকে আপনি নিজেও কিছু একটা করার চেষ্টা করুন। দুজনে মিলে উপার্জন করলে আপনাদের জন্য সুন্দর জীবন যাপন করা অনেক সহজ হবে। দেশে ফিরে স্বামী কী করতে চাইছেন, সেটা নির্ধারণ করার পর স্বামীকে বলুন টাকা জমাতে। তিনি যা উপার্জন করেন, সেটার পুরোটাই যেন ফ্যামিলির পেছনে খরচ না করেন। তিনি করতে চাইলেও আপনি দেবেন না। বরং নিজের উপার্জন থেকে একটা অংশ জমাতে বলুন। যখন পর্যাপ্ত টাকা হাতে থাকবে, তখনই তাঁকে দেশের আসার সিদ্ধান্ত নিতে বলুন। কারণ হাতে টাকা থাকলে নতুন কোন কর্মসংস্থান করতে তাঁকে মোটেও বেগ পেতে হবে না এবং আপনাদের পরিবারও তখন খুব বেশি গণ্ডগোল করার সাহস পাবে না। আর অন্যদিকে ততদিনে আপনার নিজের একটা কর্মসংস্থান হয়ে গেলে আপনিও স্বামীকে সাপোর্ট দিতে পারবেন, তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত হতে দেরি হলেও আপনারা আর অকূল পাথারে পড়বেন না। আর পর্যাপ্ত উপার্জন করলে শ্বশুরবাড়িতে দিতেও কোনই সমস্যা হবে না।

একটা কথা মনে রাখবেন, আপু-

সুখী ও সমৃদ্ধ জীবন পেতে গেলে কষ্ট ও পরিশ্রম অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু সেটা করতে হবে পরিকল্পিত ভাবে। হুট করে আবেগের বসে সিদ্ধান্ত নেয়া বা পরিকল্পনা বিহীন দাম্পত্য- দুটোর কোনটাই সুখ বয়ে আনে না।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top