পাঠকের প্রশ্ন : পরিবার চাইছে আমি যেন আমার স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে দিই…

আমার বয়স ২৩ বছর। আমি একটি প্রাইভেট ভার্সিটি তে BBA পড়ছি। আমি খুব মানসিক সমস্যায় আছি। এক বছর আগে আমার বিয়ে হয়। ছেলে খুব বড় ব্যবসায়ী। বিয়ের পর থেকেই সে আমাকে মারধোর করে। আমার বাবা-মাকে নিয়ে সারাক্ষণ নোংরা কথা বলে। আমাকে সারাক্ষণ কন্ট্রোল করতে চায়। আমার খাওয়া, ঘুম, বাইরে যাওয়া সব কিছুতেই সে তীব্র ডোমিনেট করে এবং দিনে-দিনে তার এই অত্যাচারের মাত্রা বাড়ছে।

সে যখন মারে তখন তার কোনো কন্ট্রোল থাকে না। আমি অনেকভাবে বুঝিয়েছি, পরিবারের সবাই বুঝিয়েছে। তখন সে বলে- আচ্ছা ঠিক আছে, আমি এসব আর করব না। কিন্তু একই কাজ সে বারবার করে। আমি এখন তার কাছে নিজেকে নিরাপদ মনে করি না। এখন আমার পরিবার চাইছে আমি যেন আমার স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে দিই। কিন্তু তার প্রতি আমার প্রচণ্ড মায়া কাজ করে। তাকে ছাড়া জীবন কাটাতে হবে, আর কখনোই তাকে দেখতে পাব না এটি ভাবলে পিছিয়ে যাই। তাছাড়া ডিভোর্সি মেয়েদের অনেক সমস্যা সমাজে, ভবিষ্যতে আর বিয়ে নাও হতে পারে- এসব ভেবে ভেবে প্রচণ্ড প্রেশারে থাকি।

কিন্তু তাকে নিয়ে কোনোভাবেই আর থাকা সম্ভবও হচ্ছে না। সে এমনভাবেই মারধোর করে, আমার নাক মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে যায়। বিয়ের পর বুঝেছি এটাই তার পারিবারিক শিক্ষা। তার বাবাও তার মাকে মারে। আমি তাকে জীবনে রাখতেও পারছি না আবার জীবন থেকে বাদ ও দিতে পারছি না। আপু, আমার কী করা উচিত অনুগ্রহ করে জানাবেন।

প্রশ্নটি আমাদের ফেসবুক পেজে করেছেন : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন তরুণী

পরামর্শ : আপু, আমি ১০০ ভাগ তোমার পরিবারের সাথে একমত। আমি মনে করি নিজের পরিবারের কথাই তোমার মেনে নেয়া উচিত এবং অতি সত্বর এই লোকটিকে ডিভোর্স দেয়া উচিত। দাম্পত্যে অনেক কিছুই হয়তো মেনে নেয়া যায়, একবেলা কম খেয়ে বা কম পরেও জীবন কাটিয়ে দেয়া যায়, কিন্তু মারধোর করা কখনোই কোনভাবে মেনে নেয়া উচিত না। যে সম্পর্কে সম্মান নেই, সেটা আবার কীসের সম্পর্ক! সবচাইতে বড় কথা তার সাথে তুমি আর নিজেকে নিরাপদ বোধ করো না। 

খুব সহজ করে তোমাকে একটি কথা বলি আপু, মায়া আর ভালোবাসা এক জিনিস নয়! যে পুতুল নিয়ে আমরা খেলি বা যে কোলবালিশ নিয়ে ঘুমাই, সেগুলোর জন্যেও তো মায়া হয়, আপু। হয় না বলো? সেখানে এই লোকটি তো স্বামী, তার সাথে এক বছর যাবত সংসার করছ। ছেড়ে যেতে তাই মায়া হতেই পারে। কিন্তু এই মায়ার কারণে আজীবন এভাবে মার খেতেই থাকবে? এই মারের কারণে যদি হুট করে একদিন মরে যাও বা একটা কঠিন অসুখ বাঁধিয়ে ফেলো, তাতে কি লোকটার কোন কষ্ট হবে? হবে না! তোমার তার জন্য মায়া হচ্ছে, কিন্তু তার কি তোমার জন্য মায়া হয় বলো? মায়া বা ভালোবাসা থাকলে কি এমন জানোয়ারের মত তোমার গায়ে হাত তুলতে পারতো?

তুমি মানুষ, আপু। একজন শিক্ষিত নারী। আমি মনে করি না যে কোনভাবেই এই অমানবিক নির্যাতন তোমার মেনে নেয়া উচিত।গায়ে হাত তোলা হচ্ছে দাম্পত্যের সেই শেষ লিমিট, যেটা ক্রস করার পর আর কোন কথাই অবশিষ্ট থাকে না। বিয়ের পর প্রথম এক দেড় বছর দম্পতিদের খুবই ভালো যায়। এই সময়েই যদি সে তোমার সাথে এমন আচরণ করে, তাহলে ভবিষ্যতে কী করবে বলতে পারো?

তোমার বয়সটি অনেক কম, তাই নিজের আবেগগুলোকেও অচেনা লাগছে। তাই আমার মনে হয় অন্তত এই ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিজের পরিবারের হাতে ছেড়ে দাও এবং তাদের কথা মেনে নাও। নাহয় হয়তো একসময় সেইদিন আসবে যখন চাইলেও পরিবারের সহায়তা পাবে না। পরিবার বলবে- “তুমি নিজেই তো ডিভোর্স দাওনি!” প্লাস, এই লোকের সাথে সন্তান হয়ে গেলে আরও শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে যাবে তুমি। তাই সিদ্ধান্ত যা নেয়ার, পরিবারের মুরুব্বীদের সাথে কথা বলে নিয়ে নাও।

আর হ্যাঁ, আরও একটি ভুল ধারণা এই যে ডিভোর্সি মেয়েদের সমাজ ভালো চোখে দেখে না বা তাদের ভালো বিয়ে হয় না! সেই দিন কি আর আছে বলো? এখন যুগ বদলেছে, মানুষ বদলেছে। তুমি এখনো অনেক ছোট, পুরো জীবন তোমার সামনে পড়ে আছে। একটা ডিভোর্স হবার সাথে সাথেই যে আরেকজনকে বিয়ে করে গলায় ঝুলে পড়তে হবে, মোটেও সেটা নয়। যদি ডিভোর্স নাও, তাহলে তারপর হুট করেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেবে না। মন দিয়ে লেখাপড়া করবে, ক্যারিয়ার গুছাবে, তারপরও বিয়ের কথা ভাবা উচিত হবে। যদি ধৈর্য ধারণ করে জীবনের প্ল্যান করো, একসময় অবশ্যই নিজের জন্য সঠিক একজন মানুষ খুঁজে পাবে। আর ডিভোর্সের পরই যদি বিয়ের জন্য অস্থির হয়ে যাও, আবারও ভুল করার সম্ভাবনা প্রবল।

ও হ্যাঁ, আরও একটি কথা। যদি দেখো যে স্বামীর জন্য খুব বেশিই খারাপ লাগছে বা তুমি মন থেকেই তাকে ভালোবেসে ফেলেছো, তাহলে ডিভোর্সের আগে তাকে আরও একবার সুযোগ দিতে পারো। তাকে সংশোধন করার একটা চেষ্টা করে দেখতে পারো। বাবার বাড়িতে চলে যাও, সেখান থেকে তাকে জানিয়ে দাও যে তুমি আর তার সাথে সংসার করবে না। এই মারধোর আর সহ্য করতে পারছো না। কোনদিন যদি সে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে, কেবল তখনই তুমি তাঁর ঘরে ফিরবে। অন্যথায় নয়।

এরপর কিছুদিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করবে, আপু। মন শক্ত করে থাকবে, সে ডাকলেই তার কাছে দৌড়ে যাবে না। তিনি যদি তোমাকে ভালোবেসে থাকেন, তাহলে তোমার এই দূরে থাকায় তার মাঝে পরিবর্তন আসবে। তিনি হয়তো নিজেকে সত্যিই পরিবর্তন করবেন ও কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করবেন। যদি করেন, যদি নিশ্চিত হতে পারো যে তিনি আর গায়ে হাত তুলবেন না, তাহলে স্বামীর ঘরে ফিরে যেও। সামাজিক ও পারিবারিকভাবেই ফিরে যেও। আর স্বামী যদি নিজেকে সংশোধন না করেন, মারধোর চালিয়েই যান- তাহলে জেনে নেবে যে তিনি তোমাকে কখনো ভালোবাসেননি। আর যে মানুষ ভালোবাসে না, মানুষ হিসাবে এতটুকু সম্মান দেয় না… তাঁর সাথে সংসার করবে কি করবে না, সেই সিদ্ধান্ত তখন তুমি নিজেই নিও না হয়।

শুভকামনা তোমার জন্য আপু।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top