পাঠকের প্রশ্ন: তারিখ ঠিক হবার পরও আমি বিয়ে ভেঙে দিয়েছি

যদিও আমি নিজের সমস্যা কারো সাথে শেয়ার করতে চাইনা। কিন্তু ইদানিং খুব অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছি। আসেপাশের সব খুব বেশি অগোছালো হয়ে গেছে। আমার প্রধান সমস্যা হচ্ছে আমার সবচেয়ে কাছের লোকজন। বাবা, মা ও একমাত্র ছোট ভাই। এদের কারো সাথেই আমার ঠিক যেন আর কিছুতেই মিলছে না। নিজেকে ভিষণ একা আর অসহায় মনে হচ্ছে।

এইটুকু পড়ে আমাকে টিনেজ ভাবতেই পারেন। তবে আমার চাকরির বয়স ৪ বছর। আমি একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা। জীবনের এই সময়ে এ ধরণের চিন্তা খুব অবিবেচকের মতন। যাকেই বলব সে-ই বলবে- ধৈর্য ধর, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিংবা সুখে থাকতে ভুতে কিলায় টাইপ কথাও শুনতে হবে।

কিন্তু আমার এই চিন্তাটা নতুন না। অনেক ছোটবেলা থেকেই নিজেকে একা লাগত। তখন নিজেকে দোষারোপ করতাম। আমি কেন কালো, মোটা আর লম্বা? সাথে চশমাও ছিল। নিজেকে খুব খারাপ মেয়ে মনে হত। বাড়ির বড় মেয়ে। একদম ছোটবেলাটা খুব আদরে কেটেছে। তবে যখন থেকে আমার আইডেন্টিটি একজন বাচ্চার বদলে মেয়ে হয়ে গেল, তখন থেকেই আমার কমতি গুলো আমাকে চোখে আংগুল দিয়ে দেখানো শুরু হল।

আমি অলস।

ঘরের কোন কাজ পারিনা।

দেখতে অসুন্দর।

কথাও বলতে পারিনা।

এর সাথে ছিল ভাই হবার পর হুট করে আমাকে বড় বানিয়ে দেয়া। ‘ভাই মারলে কি হয় তুমি না বড়”- এসবের সাথে সাথে আরো অনেক কিছু। তারপর বন্ধুদের মাঝে আমি খুব একটা জনপ্রিয় ছিলাম না। তবে বন্ধু নিজে থেকে বানাতে না পারলেও তাদের ধরে রাখতে চাইতাম সবসময়। আমার বন্ধুরা এখোন কিছু বললে সেটা করে দিতে চেষ্টা করি। তাতে আমার যত কষ্টই হোক না কেন।

আস্তে আস্তে আমিও বড় হলাম। খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারতাম না। তাই একসময় কথা বলা কমিয়ে কথা শোনায় মনযোগী হলাম। কিছুটা বুঝতে শিখলাম আশপাশের জগতকে। তবুও শুন্যতা ছিল। কলেজ পর্যন্ত যে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল, অনার্সের প্রতিষ্ঠান আলাদা হবার সুবাদে বন্ধুত্ব ভেঙে গেল। আমি কল করলে ও কথা বলত। কিন্তু নিজে থেকে কল করত না। শেষে আমিও কল দেওয়া বন্ধ করে দিলাম।

এরপর মাস্টার্স কমপ্লিট করে চাকরির জন্য দৌড় শুরু। প্রচন্ড ইচ্ছা ছিল বিসিএস ক্যাডার হব। হওয়া হল না। আর বিসিএস চেষ্টা করার জন্য আমার যতগুলো বিয়ের সম্বন্ধ আসত সবাই জিজ্ঞেস করত বর্তমান চাকরি ছেড়ে বিসিএসে কেন যাব? এখানেও সবাই কম্প্রোমাইজ করতে বলল। সবাই বলল- কী দরকার, বিসিএসই লাগবে কেন? ফলসরূপ এখনো বিয়ে হয়নি। সেই সাথে বিসিএসের স্বপ্নও বিসর্জন দিয়েছি বয়স থাকা সত্বেও। বিয়ে করতে আমি রাজি , কিন্তু প্রস্তাব আসা কোন ছেলেকেই পুরোপুরি পছন্দ হচ্ছেনা। তার উপর একটা সম্বন্ধ বিয়ের ডেট ঠিক হয়ে যাবার পরে ছেলের কথার ধরণ পছন্দ না হওয়াতে আমি নিজে ভেঙে দিয়েছি।

এখন আসছি নিজের পরিবারের প্রসঙ্গে। বাবা রিটায়ার করে সারাদিন বাসায় থাকে। আমার বিয়ে দেওয়াটা তার কাছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টার্গেট এচিভ করার মত হয়ে গিয়েছে। মা অনেকটা বোঝে আমাকে। তবে তার নিত্য নেগেটিভ অভিযোগগুলো মানতে পারিনা। ছোটবেলারগুলো তো আছেই। সাথে যোগ হয়েছে সব খাবার খেতে চাইনা, হোস্টেলে একা থেকে শুচিবায়ু গ্রস্ত হয়ে গেছি ইত্যাদি।

ভাই কেবল এল. এল. বি পাস করেছে। কিছুই করেনা, কিন্তু বাবার যতুটুকু সম্পত্তি আছে সেটা গুছিয়ে নিতে চাইছে। এ বিষয়ে কিছু কথা বলতে গিয়েছিলাম। তাতে তার ধারণা হয় আমি অবশ্যই সম্পত্তির ভাগ চাইতে আসব। এছাড়া আরো নানা ইস্যু আছে ওকে নিয়ে।

আমি ইদানিং খুব বেশি মাত্রায় লো ফিল করছি। সামান্য কিছু কি বলতে পারেন যাতে নিজেকে একটু চাঙ্গা করতে পারি। আগে এরকম হলে মুভি দেখতাম, বই পড়তাম কিন্তু এখন তাতেও কাজ হচ্ছেনা। নিজের বাসাই নিজের কাছে সবচেয়ে অসহ্য হয়ে গিয়েছে। ধন্যবাদ আপু , এতক্ষণ ধৈর্য ধরে আমার কথা পড়ার জন্য। আমার না সব কথা বলার মত কোন মানুষ নাই।

প্রশ্নটি আমাদের ফেসবুক পেজে করেছেন : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন।

পরামর্শ: চিঠি পড়ে মোটেও আপনারে টিন এজার ভাবছি না, আপু। বরং সত্যি বলি, আপনার মতই আরও অনেক আপুর সাথে আমার দেখা হয় প্রতিদিন কথা বলতে গেলে জানতে পারি যে সকলের মূল কষ্টের গোঁড়াটা ওই একখানেই আটকে আছে- পরিবার! আমাদের সমাজের কুৎসিত কিছু অন্ধ বিশ্বাসের কারণে কেউ কেউ নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যেতে বসেছেন, সেটা বোঝার ক্ষমতা আমাদের পরিবারগুলোর নেই। বরং পরিবারগুলোই উল্টো আমাদেরকে আরও ঠেলে দেয় সমাজের জাঁতাকলের নিচে। আমাদের সমাজে মেয়ে হয়ে জন্মগ্রহণ এক মহাপাপ যেন। মেয়ে হলেই চোখ ধাঁধানো সুন্দরী হতে হবে, নায়িকাদের মত ফিগার থাকতে হবে। মেয়ে চাকরিজীবি হোক, কিন্তু বিদুষী হলে মহাপাপ। মেয়ে চাকরি করবে শ্বশুরবাড়ির জন্য, তাঁদের মর্জি মাফিক। মেয়ের নিজের স্বপ্ন থাকতে পারবে না, নিজের লক্ষ্য থাকতে পারবে না। আর মেয়ের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে বিয়ে করা ও সন্তান জন্ম দেয়া। সেটা যদি কোন মেয়ে একটা নির্দিষ্ট বয়সে করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আর কথাই নেই। এই সমাজ পারলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিঁড়ে নেয় তাঁকে।

এই সমস্যার আপাতদৃষ্টিতে কোন সমাধান নেই। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির সহসা কোন পরিবর্তন হবে, এই আশায় বসে থাকলেও হবে না। পরিবর্তন করতে হবে মূলত নিজের দৃষ্টিভঙ্গির। সকলে মিলে জীবনটাকে প্রতিকুল বানিয়ে দিল বলেই কি আমি বা আপনিও কষ্ট করে বেঁচে থাকবো? একদম নয়! তাহলে তো যারা আমাদেরকে কষ্ট দিতে চাইলো, তাঁরাই সফল হয়ে গেলো। হলো না বলুন? একটাই মাত্র জীবন, সেই জীবনটা মানুষের কথা শুনে শুনে মন খারাপ করে কাটিয়ে দিলে হবে? দেখুন আপু, কটু বাক্য হচ্ছে উপহারের মত। আপনি যদি গ্রহণ করেন, সেটা আপনার। যদি গ্রহণ না করেন, তাহলে সেটা আর আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।

আপনার সবচাইতে বড় সমস্যা আপু এটাই যে আপনি নিঃসঙ্গ, আপনার মনের কথা বলার মানুষ নেই। পরিবার থেকে যে সাপোর্টটুকু পাবার কথা ছিল, সেটুকু পেলে নিজেকে এতটা নিঃসঙ্গ মনে হতো না। তবে কষ্টের কথা এই যে- কেবল আপনি নন, আপনার মত আরও অনেক মেয়েই আছে যারা নিজেদের চেহারা বা বিয়ে দেরীতে করা নিয়ে পরিবারের কাছেই মানসিক নির্যাতনের শিকার। মেয়েটির ক্যারিয়ারে কত সফল বা কতটা বিদুষী এসব কেউ দেখে না, সকলের একমাত্র লক্ষ্য থাকে কোনক্রমে একটা ছেলে ধরে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেয়া। মেয়েটি কী চায়, সেটা কেউ ভেবেও দেখে না! এমনকি আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুবান্ধবেরাও একটা সময়ে গিয়ে ওই একই বিষয়ে কথা বলে- বিয়ে কেন হচ্ছে না? কবে বিয়ে করবে? ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি জানি আপু, এগুলো সহ্য করা কত কঠিন। একটা সময়ে সূচের মতন বিঁধতে থাকে মনের মাঝে। বিশ্বাস করুন আমি জানি। আমিও ছোট বেলা থেকে মোটা। একটু নই, বেশ মোটা। লম্বা এবং চশমাও ছিল চোখে। কতটা ভালো ছাত্রী বা কী সেটার চাইতে সবার মনে কেবল একটাই প্রশ্ন ছিল- এই কালো, মোটা মেয়ের বিয়ে হবে কীভাবে? একটা সময়ে আমিও ভাবতে শুরু করেছিলাম এই যে আমি মনে হয় অনেক খারাপ, নাহলে সবাই এমন বলে কেন? কিন্তু নিজের স্বপ্নকে কোন নষ্ট হতে দিই নি। ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে ঠিক সেটা সেটা করেছি যা আমি করতে চাই। নিজের পছন্দের একটা মানুষের সাথে সংসার পেতেছি ঠিক ত্রিশ বছর বয়সে। “বিয়ে হয়েছে” এই টার্মটায় আমার ঘোর আপত্তি। আমি বলবো যে আমরা বিয়ে করেছি, পরস্পরকে। আমি কি সুখে নেই? মানুষের কথা কি আসলেই আমার জীবনের কোন ক্ষতি করতে পেরেছে? পারেনি এবং আলহামদুলিল্লাহ্‌ আমি খুব সুখে আছি নিজের জীবনে। কারণ কী জানেন? কারো হচ্ছে আমি কোনদিন কারো কথায় নিজেকে থামতে দিইনি, বরং নতুন উদ্যমে চালিয়ে গিয়েছি নতুন উচ্চতার পথে যাত্রা।

আপনি নিজেকে করুণা করা বন্ধ করুন আপু, মানুষের কথাকে সত্য ভাবাও বন্ধ করুন। নিজের জীবনের লক্ষ্য পূরণে সচেষ্ট হোন, কারণ জীবন একটাই। আর হ্যাঁ আপু, আজকাল ঘরের কাজ জানাটা সময়ের দাবী। নারী পুরুষ সকলকেই জানতে হয়। আপনি অলস বা কাজকর্ম করেন না, এসব বিষয়ে অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে একটু শিখে নিন। কখনো একা থাকতে হলে বা বিদেশে গেলেও কিন্তু এটা কাজে লাগবে। অন্যদিকে মায়েরও একটু হেল্প হবে। অন্যদিকে ভাই বা বাবার সম্পদ নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাবেন না। আপনি ভালো চাকরি করেন, নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই গড়ে নেবেন। বিয়ে করবেন না কেন, অবশ্যই করবেন। তবে বিয়ে কেন হচ্ছে না, এটা নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। ভালো একটা মানুষ কি আর চট করে মেলে? তবে হ্যাঁ, একদিন এমন একটা মানুষ অবশ্যই খুঁজে পাবেন যিনি আপনার নীরবতা থেকেই খুঁজে নেবেন মনের কথা। বিশ্বাস করুন, তেমন পুরুষেরা অবশ্যই আছে, যারা স্ত্রীকে মানুষের মত ট্রিট করেন। স্রেফ একটা পণ্য হিসাবে নয়! একটু ধৈর্য রেখে নিজের মানুষটাকে খুঁজে হয় কেবল।

মন যদি খুব বেশি খারাপ লাগে, তাহলে একজন কাউন্সিলারের কাছে যান কিছুদিন। নিজের মনের সমস্ত কথা তাঁকে খুলে বলুন। কাউন্সিলারের কাছে যাওয়া মানেই কিন্তু মানসিক রোগী হওয়া নয়, আপু। কাউন্সিলার হচ্ছে সেই সঙ্গী, যিনি বন্ধুর মত আপনার সব কথা শুনবেন এবং আপনার সিক্রেটগুলি তার কাছে নিরাপদে থাকবে। তিনি আপনাকে জাজ করতে যাবেন না বা আপনাকে খোঁটাও দিতে যাবেন না। অনেক বছরের অনেক ক্ষোভ জমে আছে তো, বলতে বলতে দেখবেন এক সময়ে মনের ভেতরটা হালকা হয়ে গিয়েছে। স্বার্থপর বন্ধুকে বিশ্বাস করার চাইতে একজন কাউন্সিলারকে বিশ্বাস করাটা নিরাপদ।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top