যে কৌশলে গরুর মাংস ৪৫০ থেকে ৫২৫ টাকা

কৌশল মাত্র চার মাসের। এ বছরের জানুয়ারি মাস থেকে গরুর মাংসের দাম বাড়তে থাকে। ৪৫০ টাকার এক কেজি গরুর মাংস প্রথমে ৪৮০ টাকা। কিছুদিন পর ৫০০ টাকা। ফেব্রুয়ারি মাসে হয়ে যায় ৫২৫ টাকা। এরপর মার্চ ও এপ্রিল মাসজুড়ে এক লাফে ৫৫০ টাকায় বিক্রি করতে থাকেন মাংস ব্যবসায়ীরা। তবে রমজান মাস উপলক্ষে গরুর মাংসের দাম ৫২৫ টাকা নির্ধারণ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এর মধ্য দিয়ে গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৭৫ টাকা বাড়িয়ে নিয়েছেন মাংস বিক্রেতারা। যদিও আজ কোনো কোনো জায়গায় প্রতি কেজি গরুর মাংস ৫৮০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়।

আজ সোমবার ডিএসসিসির প্রধান কার্যালয় নগর ভবনে মাংস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন মেয়র সাঈদ খোকন। বৈঠক শেষে জানানো হয়, রমজান মাসে দেশি গরুর মাংস ৫২৫, বোল্ডার (বিদেশি) গরুর মাংস ৫০০, মহিষ ৪৮০, ছাগল ও ভেড়ার মাংস ৬৫০ এবং খাসির মাংস ৭৫০ টাকা কেজি নির্ধারণ করা হয়েছে।

২০১৮ সালের রোজায় গরুর মাংসের মূল্য ৪৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। গত বছর সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত মূল্য ছিল—বোল্ডার গরুর মাংস ৪২০, খাসি ৭২০ টাকা। তবে ভেড়া বা ছাগলের মাংস গতবারের মতো এবারও প্রতি কেজি ৬৫০ টাকা করা হয়েছে।
বৈঠক শেষে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, নির্ধারিত দামের চেয়ে কোথাও বেশি দামে মাংস বিক্রি করা হলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৈঠকে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, সীমান্তে চাঁদাবাজি এবং গাবতলী পশুর হাটে ইজারাদার গরুপ্রতি ১০০ টাকা খাজনার বদলে জোর করে ৮০০০ টাকা আদায় করছেন। তাই বাড়তি দামে গরুসহ গবাদিপশুর মাংস বিক্রি করা ছাড়া তাঁদের উপায় নেই।
চাঁদাবাজি বন্ধ করা হলে গরুর মাংস ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান বাংলাদেশ মাংস সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সীমান্ত ও গাবতলীর পশুহাটে ইজারাদারদের চাঁদাবাজি বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে অভিযোগ করেছিলাম। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। গাবতলীর হাটে মাংস ব্যবসায়ী সমিতির কার্যালয়ে তালা দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে।’
তবে গাবতলী পশুর হাটের ইজারাদারের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। গাবতলী হাট ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সানওয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এক টাকাও খাজনা নেব না। মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব ঘোষণা দিন যে তিনি কত টাকায় গরুর মাংস বিক্রি করতে পারবেন? খাজনা না নিলে তো নিশ্চয়ই মাংস ৪০০ টাকায় বিক্রি করা যাবে।’
সানওয়ার হোসেন দাবি করেন, গাবতলী হাটে পশুর ব্যাপারিদের কাছ থেকে জোর করে হাড্ডি নিয়ে নিত। চামড়া বিক্রির একটি সিন্ডিকেট ছিল। এসব বন্ধ করা হয়েছে। তা ছাড়া লাইসেন্স প্রদানের কথা বলে মাংস বিক্রেতাদের কাছ থেকে ৫০০০ টাকা থেকে ৮০০০ টাকা আদায় করত সমিতি। লাইসেন্স দেবে সিটি করপোরেশন। মাংস ব্যবসায়ীরা পারেন না। এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাংসের দাম কৌশল করে বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

মাংসের দাম প্রতিবছর যেভাবে বেড়েছে
রমজান মাস শুরুর আগে মাংসের দাম নির্ধারণ করে থাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। মাংস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে এই দাম নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত এই দাম অনুসরণ করেন ঢাকাসহ সারা দেশের মাংস বিক্রেতারা। এই সুযোগই কাজে লাগান তাঁরা। তাই বৈঠকের বেশ কয়েক মাস আগেই গরুর মাংসের দাম বাড়িয়ে দেন মাংস বিক্রেতারা।

২০১৩ সালের রমজান মাসের আগে প্রতি কেজি গরুর মাংস ছিল ২৫০ টাকা। কিন্তু হঠাৎ দাম বাড়ানো হয়। পরে মাংস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে সিটি করপোরেশন ওই বছর গরুর মাংসের দাম নির্ধারণ করে ২৭৫ টাকা।

একইভাবে ২০১৪ সালের রমজানে ২৮০ টাকা, ২০১৫ সালের শুরুতে ২৮০ টাকা থেকে ৩০০ টাকায় প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হতো। কিন্তু ভারতের বিজেপি সরকার সীমান্ত দিয়ে গরু আনা বন্ধ করে দিয়েছে—এই কারণ দেখিয়ে গরুর মাংসের দাম উঠে যায় ৩৭০ টাকায়। এরপরই দেশে অসংখ্য গবাদিপশুর খামার গড়ে ওঠে।

ভারত থেকে গরু আসা বন্ধের কারণ দেখিয়ে ২০১৭ সালে রমজান মাসে গরুর মাংসের দাম আরও কয়েক দফা বাড়ান মাংস বিক্রেতারা। ওই বছর রমজানে সিটি করপোরেশন গরুর মাংসে দাম নির্ধারণ করে ৪২০ টাকা।

একই অজুহাতে ২০১৭ সালের রমজানে দেশি গরুর মাংস ৪৭৫ এবং ভারতীয় গরুর মাংসের দাম ৪৪০ টাকা হয়ে যায়। সবশেষ ২০১৮ সালের রমজানের আগে গরুর মাংসের দাম ৫০০ টাকা নির্ধারণের দাবি করেন মাংস বিক্রেতারা। তবে নানা কারণে গরুর মাংসের দাম ৪৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবুও গত রমজানের শুরুতে ৫০০ টাকায় মাংস বিক্রি করতে থাকেন বিক্রেতারা। এ সময় র‍্যাবসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের কারণে ৪৫০ টাকায় বিক্রি করেন তাঁরা। তবে ২৫ রোজার পর দাম ৫০০ টাকার ওপরে নিয়ে যান মাংস বিক্রেতারা।

দাম অতিরিক্ত উঠে যাওয়ায় মাংস বিক্রি কমে যায়। তাই ২০১৮ সাল থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করত গরুর মাংস। কিন্তু বছর ঘুরে রমজান মাস আসার আগে গরুর মাংসের বর্তমান দাম ৫৫০ টাকা।

মাংসের দাম এভাবে বৃদ্ধির প্রতিবাদ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গরুর মাংস সাধারণ মানুষের একটি প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য। দফায় দফায় এই মাংসে দাম বৃদ্ধির ফলে গরুর মাংস বিলাসী পণ্যে পরিণত হয়েছে। তাই আমাদের উচিত এক সপ্তাহ কোনো রকম মাংস না কিনে এই মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ করা। যখন কেউ কিনবে না, তখন মাংসের দাম এমনিই কমে আসবে।’

মোহাম্মদপুরের একজন বাসিন্দা বলেন, তিনি আজ সোমবার ৫৮০ টাকা কেজি দরে গরুর মাংস কিনেছেন। দাম বেশি কেন জানতে চাইলে তাঁকে মাংস বিক্রেতা পাল্টা বলেছেন, আসন্ন ঈদে ৬০০ টাকা কেজিতে কিনতে হবে গরুর মাংস।

এদিকে মাংসের দাম বৃদ্ধিতে মুরগি ও মাছের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল রোববার ঢাকার বিভিন্ন বাজারে সোনালি মুরগির কেজি ২৫০ টাকা ছিল। আজ ২৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগি ৫৮০ থেকে ৬০০ টাকা এবং ফার্মের মুরগি ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে ডাল, ছোলা, বেসন, পেঁয়াজ, সয়াবিন তেলের দাম গত বছরের মতোই বয়েছে। অবশ্য সবজির দাম চড়া রয়েছে। সব ধরনের সবজি ৫০ টাকা বা তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
ছোট লেবু গতকাল প্রতি পিস বিক্রি হয়ছে তিন টাকায়, আজ এর দাম হয়েছে পাঁচ টাকা করে। বড়গুলো বেড়েছে প্রতি পিসে পাঁচ টাকা করে। বেড়েছে শসার দামও। কারওয়ান বাজারে গতকাল শসার পাল্লা (৫ কেজি) বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকায়। আজ তা বেড়ে হয়েছে ১৫০ টাকা।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top