শিশুর মানসিক বিকাশে যা জানা মা এ দের জন্য জরুরি

ডা. মাহাবুবা রহমান

ধরুন আপনার দেড় বছরের বাচ্চাটিকে আপনি অনেকগুলো খেলনা দিয়ে বসিয়ে রেখেছেন, বাচ্চা খেলবে এই ভেবে। কিন্তু আপনি দেখলেন সে খেলছে তো না-ই, উল্টো প্রত্যেকটা খেলনা হাতে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ছুড়ে ফেলছে। স্বাভাবিকভাবেই আপনি বাচ্চার উপর মহা বিরক্ত হলেন। তবে এই বিরক্তি শুধু আজকের ঘটনার জন্য নয়। আগেও আপনি খেয়াল করেছেন বাচ্চা প্রায়ই হাতের কাছে যা পায়, জানালা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। আপনি মনে মনে ভাবেন, আপনার বাচ্চা এত দুষ্টু কিভাবে হলো! এখনই এই অবস্থা, বড় হলে না জানি কী করে!

প্রথমত আপনি নিশ্চিত থাকেন যে আপনার বাচ্চার এই যে কর্মকাণ্ড, এটা স্রেফ দুষ্টুমি না। এর সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখা রয়েছে। দ্বিতীয়ত বাচ্চা বড় হওয়ার পর আর এই ঘটনা ঘটাবে না, সে ব্যাপারেও নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। বড়জোড় আর ৬ মাস, তারপরই হয়তো আপনার বাচ্চা নতুন কিছু শুরু করবে আর আপনার জীবনে যুক্ত হবে নতুন দুশ্চিন্তা! এ সবকিছুই আপনার সন্তানের মানসিক বিকাশের অংশ।

মানসিক বিকাশের মূলনীতি
সুইস সাইকোলজিস্ট জা পিয়াজের মতে, একটি শিশু জন্মের পর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত মানসিক বিকাশের বিভিন্ন ধাপের মধ্য দিয়ে যায় এবং একটি ধাপ পুরোপুরি সম্পন্ন হওয়ার পরেই কেবল সে পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করতে পারে।

পিয়াজের মতে, মানসিক বিকাশের প্রাথমিক স্তরটি গঠিত হয় কিছু সুনির্দিষ্ট মানসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়া হচ্ছে অনেকটা কম্পিউটার সফটওয়্যারের মত, যার মাধ্যমে একজন মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন ঘটনাবলী (কম্পিউটারের ডেটা স্বরূপ) ধারন, বিশ্লেষণ এবং সেই অনুযায়ী পরিচালনা করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি ছয় মাস বয়সী বাচ্চার হাতে একটি বল ধরিয়ে দেন, বলটি সে প্রথমেই মুখে ঢুকাবে। এর কারণ হচ্ছে জন্মগতভাবে একটি শিশু মাতৃদুগ্ধ পানের যে মানসিক প্রক্রিয়া নিয়ে জন্মায়, তার ফলস্বরূপ পরবর্তীতে তার মুখের কাছে বা হাতে যা দেওয়া হয়; সেটি সে মুখে নিয়ে চুষতে থাকে।

তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে যে, বড় হতে হতে বাচ্চার এ স্বভাব আর কেন থাকছে না? এর কারণ বাচ্চার মানসিক বিকাশ তো আর একটি স্তরে থেমে থাকছে না, পিয়াজের তত্ত্ব অনুসারে তা বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন স্তর পার হয়ে অবশেষে পূর্ণ মানসিক পরিপক্বতা পায়। এবং প্রতিটি স্তরে তাদের মানসিক প্রক্রিয়ার কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংযোজন ঘটে; পিয়াজে যার নাম দিয়েছেন অ্যাসিমিলেশন এবং অ্যাকোমোডেশন।

অ্যাসিমিলেশন হচ্ছে ইতোমধ্যে বিদ্যমান স্কিমার সাহায্যে কর্ম সম্পাদন। অর্থাৎ উপরের উদাহরণে যে বাচ্চাটা বল নিয়ে মুখে পুরল, সেখানে সে তার বিদ্যমান স্কিমাকে (মাতৃদুগ্ধ পান) কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করল। আবার আরেকটি বাচ্চা হয়তো চিড়িয়াখানায় উড়ন্ত কাঠবিড়ালিকে ‘পাখি’ বলে চিহ্নিত করল। কারণ তার মনের মধ্যে পাখির একটি স্কিমা রয়েছে এরকম যে ‘যা উড়তে পারে সেটাই পাখি’।

অন্যদিকে অ্যাকোমোডেশন হচ্ছে বিদ্যমান স্কিমার কিছুটা পরিবর্তন বা সংযোজন অথবা সম্পূর্ণ নতুন কোন স্কিমা তৈরিকরণ। যেমন- উপরের উদাহরণের দ্বিতীয় বাচ্চাটি উড়ন্ত কাঠবিড়ালিকে সরাসরি ‘পাখি’ না বলে যদি বলে ‘লেজওয়ালা পাখি’ বলে; তবে সেটি হবে স্কিমার সংযোজন। আবার প্রথম বাচ্চাটির ক্ষেত্রে বলের জায়গায় যদি একটা বড়সড় কাগজের বাক্স রাখা হয় যেটি সে মুখে নিতে পারছে না, তখন সে হয়তো বাক্সটি ঠেলতে শুরু করবে (নতুন স্কিমা তৈরি)।

মোটকথা পুরো ব্যাপারটিকে এককথায় এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, আমরা যখন কোন নতুন কম্পিউটার কিনি; তখন অনেক সফটওয়্যার তার মধ্যে অলরেডি ইন্সটল্ড থাকে। পরবর্তীতে সেসব সফটওয়্যারের সাহায্যে আমরা সরাসরি কিছু কাজ করতে পারি, আবার কোনো কোনো সময় কাজ করতে গেলে সফটওয়্যার আপডেট করা লাগে।

মানসিক বিকাশের স্তরসমূহ: মেন্টাল স্কিমাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে জা পিয়াজে মানসিক বিকাশকে চারটি স্তরে ভাগ করেছেন–

সেন্সরিমোটর স্টেজ: জন্মের পর থেকে ২ বছর বয়স পর্যন্ত এর ব্যপ্তি। সেন্সরিমোটর নাম থেকেই বোঝা যায় এ স্টেজে শিশু তার সেন্সরি অর্থাৎ ইন্দ্রিয় এবং মোটর অর্থাৎ মুভমেন্টের সাহায্যে বিভিন্ন বস্তু সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। এ কারণেই এ বয়সী বাচ্চারা খেলনা পেলে হাত বাড়িয়ে ধরতে চায়, মুখে নিয়ে স্বাদ নিতে চায় আবার ছুড়ে ফেলে শব্দ শুনতে চায়। সেই সাথে এ বয়সী বাচ্চারা অন্যদের অনুকরণ করা শুরু করে। যেমন- বাবা মাথা দোলালে সেও একইভাবে মাথা দোলাতে চায়, একই রকম মুখভঙ্গি করার চেষ্টা করে।

আরেকটি ইন্টারেস্টিং জিনিস হচ্ছে ‘অবজেক্ট পারমানেন্স’। জন্মের পর থেকে মোটামুটি ৬ মাস বয়স পর্যন্ত বাচ্চার অবজেক্ট পারমানেন্স থাকে না। এ বয়সী বাচ্চারা ভাবে, যা দেখা যায় না তার আসলে অস্তিত্বই নেই! এজন্য এ বাচ্চাদের চোখের সামনে আপনি যতক্ষণ কোন বস্তু রাখবেন, ততক্ষণ সেই বস্তুর প্রতি তাদের আগ্রহ থাকবে। যখনই সরিয়ে ফেলবেন, তারা সেটি বেমালুম ভুলে যাবে। একটিবারের জন্যও তারা বস্তুটি খুঁজতে চাইবে না কিংবা খুঁজে না পেলে কান্নাও করবে না।

ধীরে ধীরে বাচ্চার বয়স যখন ৮-১১ মাস, তখন তার মধ্যে অবজেক্ট পারমানেন্স ডেভেলপ করে। এ বয়সী বাচ্চাদের চোখের সামনে থেকে আপনি সহজে কিছু সরাতে পারবেন না, সরিয়ে ফেললে তারা কান্না করবে এবং পুনরায় খুঁজে পেতে চাইবে।

প্রি-অপারেশনাল স্টেজ: এ স্টেজের সময়সীমা ২-৭ বছর বয়স। পিয়াজে ‘অপারেশনাল’ বা ‘অপারেশন’ বলতে আসলে বুঝিয়েছিলেন, যৌক্তিক চিন্তাভাবনা। তার মানে দাঁড়ায় এ প্রি-অপারেশনাল স্টেজটা হলো যেখানে এ যুক্তি ব্যাপারটা থাকবে না। অর্থাৎ এ স্টেজে বাচ্চা কোনো ঘটনার যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারে না এবং নিজে যুক্তি বোঝেও না। লজিকাল থিংকিংয়ের এ অনুপস্থিতি কিছু বিষয় দ্বারা বোঝা যায়। যেমন-

১. ইগোসেন্ট্রিজম: প্রি-অপারেশনাল স্টেজের বাচ্চারা ভাবে পৃথিবীর সবকিছু আবর্তিত হয় তাকে ঘিরে; সে যেটা চিন্তা করে বা তার জন্য যেটা ঠিক সেটাই সবার জন্য ঠিক। উদাহরণস্বরূপ, অনেক সময় অনেক বাচ্চাকে দেখবেন জেদ করছে যে তার নিজের ছোট্ট চেয়ার বা ছোট্ট সাইকেলটাতে তার বাবা-মাকেও বসতে হবে। কিন্তু অতটুকু একটা চেয়ার বা সাইকেলে যে অতবড় একজন মানুষ বসতে পারে না, বিষয়টা সে বুঝতে পারে না। তার ধারণা যেহেতু সে ওটাতে বসতে পারে বা তার যেহেতু জিনিসটা প্রিয় তাই তার বাবা-মাকেও ওটাতে বসতে হবে।

২. ল অব কনজারভেশন: ধরুন আমি আপনার সামনে একটি কাচের গ্লাসে দুইশ মিলি পানি ঢাললাম। এরপর দ্বিতীয় আরেকটি গ্লাসেও সমপরিমাণ পানি ঢাললাম কিন্তু দ্বিতীয় গ্লাসটি প্রথম গ্লাসের তুলনায় বেশ চিকন এবং লম্বা। স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় গ্লাসের পানির উচ্চতা প্রথম গ্লাসের পানির উচ্চতার চেয়ে বেশি দেখাবে। এরপর আমি যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, আচ্ছা দুইটি গ্লাসের কোনটিতে বেশি পানি আছে? আপনি কী উত্তর দেবেন? নিশ্চয়ই বলবেন যে কোনটাতেই বেশি নেই, দুটাতেই সমপরিমাণ পানি আছে। কারণ আপনি জানেন কেবল স্থান, কাল, পাত্র পরিবর্তন করলেই কোনো জিনিসের গঠন বা পরিমাণ পরিবর্তন হয় না।

কিন্তু আমি যদি প্রি-অপারেশনাল স্টেজের কোনো বাচ্চাকে প্রশ্নটি করতাম, সে আমাকে দ্বিতীয় গ্লাসটি দেখিয়ে বলত, ‘এটাতে বেশি পানি আছে।’ এমনকি আপনি যদি তার সামনে প্রথম গ্লাসের পানিই আবার দ্বিতীয় গ্লাসে ঢালেন তাহলেও সে একই কথা বলবে। অর্থাৎ তার মধ্যে এই ‘ল অব কনজারভেশন’ ডেভেলপ করেনি।

কংক্রিট অপারেশনাল স্টেজ: ৭-১১ বছর বয়েসের বাচ্চারা এ স্টেজের অন্তর্ভুক্ত। এ স্টেজে বাচ্চার মধ্যে যৌক্তিক চিন্তাভাবনা আসা শুরু করে। তবে এর মধ্যেও কিছুটা সীমাবদ্ধতা থেকে যায়। কারণ চিন্তা বা থিংকিং হয় দু’রকম–

১. যেসব বস্তু চোখের সামনে দেখা যায়, সেসব বিষয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা।
২. চোখে দেখা যায় না এমন বিমূর্ত বিষয়ে (যেমন- রাগ, দুঃখ, ভালোবাসা) চিন্তা করার ক্ষমতা।

এই কংক্রিট অপারেশনাল স্টেজে বাচ্চার কংক্রিট বিষয়ে লজিকাল চিন্তাভাবনা তৈরি হয়, যার ফলে বাচ্চার ইগোসেন্ট্রিজম ধীরে ধীরে চলে যায়। ল অব কনজারভেশন ডেভেলপ করে। বাচ্চা কোনো বস্তুর বাহ্যিক গুণাগুণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ধারণা অর্জন করে।

ফরমাল অপারেশনাল স্টেজ: ১১ বছর থেকে শুরু করে জীবনের পরবর্তী সময়কাল হচ্ছে ফরমাল অপারেশনাল স্টেজ। এ স্টেজেই একজন মানুষ শিশু থেকে কিশোর বয়েসে পদার্পণ করে আর সেই সাথে তার চিন্তাভাবনাও বড়দের মত হতে থাকে। কংক্রিট থিংকিংয়ের সাথে যুক্ত হয় অ্যাবস্ট্রাক্ট থিংকিং, ফলস্বরূপ মনে মনে কোনো হাইপোথিসিস তৈরি ও তার বিচার বিশ্লেষণ করা এবং বিভিন্ন মানবীয় আবেগ, অনুভূতি সম্পর্কে ধারণা জন্মায়। অর্থাৎ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের চিন্তার জগতে প্রবেশ করার শুরুটা হচ্ছে এ ফরমাল অপারেশনাল স্টেজ।

একটি জিনিস মনে রাখা প্রয়োজন, জা পিয়াজের স্টেজগুলোয় যে বয়সের রেঞ্জ দেওয়া হয়েছে; এই রেঞ্জের ক্ষেত্রে কোনো কড়াকড়ি নিয়ম নেই। যে বাচ্চার মানসিক বিকাশ খুব ভালো, সে হয়তো এক স্টেজ থেকে পরবর্তী স্টেজে খুব দ্রুত যেতে পারবে। আবার যার বিকাশ কিছুটা ধীরে, সে হয়তো অন্যদের চেয়ে একটু দেরিতে পৌঁছবে। তবে দ্রুত হোক বা দেরিতে, প্রত্যেক শিশুই প্রতিটি স্টেজের ভেতর দিয়ে তার পূর্ণ মানসিক বিকাশ অর্জন করে, এটিই পিয়াজে বলে গেছেন।

কেন জানবেন?
আপনার মনে হয়তো প্রশ্ন আসতে পারে জা পিয়াজের এত কঠিন কঠিন তত্ত্ব জেনে আপনার কী লাভ? লাভের ব্যাপারে না হয় একটু পরেই চিন্তা করলেন। তার আগে একটি বিষয় দেখুন, বাবা-মারা বাচ্চাদের ফিজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কে কমবেশি জানি। কোন বয়সে বাচ্চার দাঁত ওঠে, বাচ্চা কখন বসবে, কখন দাঁড়াবে এগুলো সম্পর্কে আমরা সচেতন। বাচ্চার শারীরিক বিকাশ সম্পর্কে যত বেশি জানি; ঠিক ততটাই কম জানি বাচ্চার মানসিক বিকাশ সম্পর্কে। তাই তো এক বছরের বাচ্চা খেলনা ছুঁড়লে কিংবা তিন বছরের বাচ্চা তার সাইকেলে বসতে জেদ করলে আমরা বিরক্ত হই।

হ্যাঁ, এটা সত্য যে অনেক বাচ্চার আচরণগত সমস্যা থাকে। যে সমস্যা প্রতিকারের জন্য অবশ্যই প্রফেশনাল হেল্প দরকার। কিন্তু আপনি বাচ্চার সমস্যাজনক আচরণকে তখনই চিহ্নিত করতে পারবেন; যখন তার স্বাভাবিক আচরণ সম্পর্কে আপনার জানা থাকবে। ইনফ্যাক্ট জা পিয়াজে নিজেও কিন্তু তার তিন সন্তানকে পর্যবেক্ষণ করে কগনিটিভ ডেভেলপমেন্টের তত্ত্বটি দিয়েছিলেন।

তাই আজকের পর থেকে সন্তানকে বাধা না দিয়ে তার স্বাভাবিক আচরণগুলো করতে দিন। সন্তানের সুন্দর মানসিক বিকাশের সহায়ক হোন। উপভোগ করুন তার শৈশব।

লেখক: রেসিডেন্ট চিকিৎসক, ডিপার্টমেন্ট অব চাইল্ড অ্যান্ড এডোলেসেন্ট সাইকিয়াট্রি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

কমেন্টসমুহ
Secret Diary Secret Diary

Top